বৈষম্যবিরোধী ছাত্রগণআন্দোলন (বি. বো. ২৫)
উত্তর: বৈষম্যবিরোধী ছাত্রগণআন্দোলন ভূমিকা: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সাধারণ শিক্ষার্থীদের দ্বারা সংঘটিত একটি সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন। মূলত কোটাসংস্কারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আন্দোলনটিই পরবতী পর্যায়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন হিসেবে রূপ লাভ করে। এরপর নানা ঘটনা পরিক্রমার মধ্য দিয়ে গত ৫ আগস্ট ২০২৪ সালে সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে তা চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করে। বাংলাদেশে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মোট তিনবার কোটা সংস্কারের জন্য বড়ো ধরনের আন্দোলন সংঘটিত হয়। সরকারি চাকরিতে কোটা কমিয়ে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগদানের দাবিতে এ আন্দোলনের সূচনা হলেও পরবর্তীকালে ছাত্র-জনতাকে হত্যা ও নির্যাতনের পরিপ্রেক্ষিতে তা সরকার পতনের এক দফার আন্দোলনে রূপ লাভ করে। আন্দোলনের কারণ ও বৈষম্যের স্বরূপ: বাংলাদেশে কোটাব্যবস্থা চালু হয় ১৯৭২ সালে। সরকারি চাকরিতে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা, ১০ শতাংশ নারী, ১০ শতাংশ জেলা, ৫ শতাংশ ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী এবং ১ শতাংশ ছিল বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শ্রেণি বা প্রতিবন্ধী কোটা। সব মিলিয়ে ৫৬ শতাংশ কোটা ছিল, যা মেধাবীদের সাথে একধরনের বৈষম্যের শামিল। তাই এ ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে চাকরি প্রত্যাশী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা কোটাসংস্কার আন্দোলন শুরু করে। (তথ্যসূত্র: প্রথম আলো: ৪ মার্চ ২০১৮) বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পটভূমি: সাধারণ শিক্ষার্থীদের লাগাতার আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর সরকার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা বাতিল ঘোষণা করে পরিপত্র জারি করে। তখন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতৃত্বে শিক্ষার্থীরা যে আন্দোলন করেছিল তা থেকেই সরকার এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ জুন সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবরের কোটা বাতিল সংক্রান্ত পরিপত্রটি অবৈধ ঘোষণা করে। আর তখন থেকেই নতুন করে এই আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলনের সূত্রপাত: সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিল করে জারি করা পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। আন্দোলনকারীদের মূল দাবি ছিল কোটার যৌক্তিক সংস্কার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার্থীদের অবদান ছিল। তবে এ আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই এবং এর একসময় মুখ্য সমন্বয়কগণও ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। রাজু ভাস্কর্য, অপরাজেয় বাংলা, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, শাহবাগ চত্বরসহ গোটা বিশ্ববিদ্যালয়। এলাকাই ছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র। এ আন্দোলন সংঘটিত হওয়ার পর থেকে একাধিক সমন্বয়ককে নেতৃত্বে দেখা গেছে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের নির্যাতন ও আত্মত্যাগ: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন অধিকতর বেগবান হয় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া 'রাজাকারের নাতিপুতি' তকমা প্রত্যাহারের দাবির মধ্য দিয়ে। এ লক্ষ্যে সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। কিন্তু তাদের সে আন্দোলনে ইতিবাচক সাড়া না দিয়ে সরকারি বাহিনী তাদের উপর ন্যক্কারজনক হামলা চালায়। সারা দেশে অসংখ্য শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষ আহত হয় এবং প্রাণ দেয়। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভূমিকা: এ আন্দোলনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। আন্দোলন দমনের নামে সরকার বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে। তারা ভেবেছিল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করলেই আন্দোলন স্তিমিত হয়ে যাবে। কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের সে ধারণা পালটে দেয়। শিক্ষার্থীদের নয় দফা: ১৯ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একটি পক্ষ ৯ দফা দাবি জানিয়ে সকল পর্যায়ে শাটডাউন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। এর পাশাপাশি ২২ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম চার দফা দাবি জানিয়ে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়ে 'কমপ্লিট শাটডাউন' কর্মসূচি স্থগিত করেন। এই চার দফার মধ্যে ছিল- ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইন্টারনেট চালু, ক্যাম্পাসগুলো থেকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী প্রত্যাহার করে ক্যাম্পাস চালু, সমন্বয়ক ও আন্দোলনকারীদের নিরাপত্তা প্রদান এবং কারফিউ প্রত্যাহার। ছাত্র আন্দোলন থেকে গণআন্দোলন: কোটাসংস্কার আন্দোলন থেকে গড়ে ওঠা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শেষ পর্যন্ত শুধু ছাত্রদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ফ্যাসিবাদের দীর্ঘ অত্যাচারে অতিষ্ঠ সর্বস্তরের জনতাও ছাত্রদের সাথে একাকার হয়ে যায়। ফলে দেশব্যাপী অসংখ্য শিশু, যুবক, নারী-পুরুষ, ছাত্র, বৃদ্ধসহ নানা বয়স ও শ্রেণি-পেশার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। এক দফার অসহযোগ আন্দোলন: সরকারের দমন-পীড়নের তীব্রতার ফলে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সরকার পতন আন্দোলনে রূপ নেয়। ছাত্ররা সরকার পতনের এক দফা দাবিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেয়। তাদের এই আন্দোলনে সারা দেশের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দিয়ে রাজপথে নেমে আসে। ফ্যাসিবাদের পতন: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক দফার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে দীর্ঘ দিনের ফ্যাসিবাদি শাসনের অবসান ঘটে। আন্দোলনকারীরা প্রথমে ৬ আগস্ট 'লংমার্চ টু ঢাকা' কর্মসূচি ঘোষণা করে। কিন্তু ৪ আগস্ট সারা দেশে ছাত্র-জনতাকে নির্বিচারে হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনায় ৬ আগস্টের 'লংমার্চ টু ঢাকা' কর্মসূচি একদিন এগিয়ে ৫ আগস্ট করা হয়। এদিন সারা দেশের ছাত্র-জনতাকে ঢাকা অভিমুখে আসার আহ্বান জানানো হয়। সকাল থেকে গোটা জাতির উদ্বেগ উৎকণ্ঠার মধ্যেই ছাত্র-জনতার ঢাকামুখী ঢল সরকারের পতন ত্বরান্বিত করে। ৫ আগস্ট দুপুরে গণ অভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেন এবং দেশ ত্যাগ করেন। রাজধানী ঢাকার প্রতিটি রাজপথ জনারণ্যে পরিণত হয়। সারা দেশের মানুষ স্বৈরাচারী সরকারের পতনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। রাজপথে মুহুর্মুহু স্লোগান সাধারণ মানুষ তাদের আনন্দোচ্ছ্বাস প্রকাশ করে। জুলাই 'বিপ্লব পরবর্তী সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ: চব্বিশের জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান, যা স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়ে এক নতুন রাজনৈতিক দিগন্তের সূচনা করেছে। অগণিত শহিদের রক্ত আর ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার সুযোগ করে দিয়েছে। আগামীর বাংলাদেশে নাগরিক অধিকার, ন্যায়বিচার এবং বাাধীনতা হবে মূল ভিত্তি। তারুণ্যের এই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র বিনির্মাণ করাই এখন এদেশের জনগণের প্রধান লক্ষ্য। উপসংহার: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন আজ বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য গৌরবোজ্জ্বল অংশ হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ স্বৈরশাসনের কবলে পড়া দেশের মানুষ যখন নিরূপায়, হতাশ ও দিশেহারা ঠিক সেই সময়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে স্বৈর শাসনের এই পতন চিরকাল অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
HSC Bangla 2nd Paper প্রবন্ধ-নিবন্ধ রচনা CQ — Prosthuti প্রশ্নব্যাংক
HSC · Bangla 2nd Paper · প্রবন্ধ-নিবন্ধ রচনা · সৃজনশীল
বৈষম্যবিরোধী ছাত্রগণআন্দোলন (বি. বো. ২৫)
উত্তর