তথ্যপ্রযুক্তি ও বাংলাদেশ ( রা. বো. ২৫; কু. বো. ২৪; য. বো. ২৪; ঘ. বো. ১৯; চ. বো. ১৯; সি. বো. ১৯; রা. বো. ১৭; ঢাকা ইমপিরিয়াল কলেজ; ময়মনসিংহ গার্লস ক্যাডেট কলেজ )
উত্তর: তথ্যপ্রযুক্তি ও বাংলাদেশ ভূমিকা: বর্তমান যুগ তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। বরফ, প্রস্তর, নবপলীয় রেনেসাঁস প্রভৃতি যুগকে অতিক্রম করে পৃথিবী আজ তথ্যপ্রযুক্তির যুগে অবস্থান করছে। বাংলাদেশের উন্নয়ন যেহেতু বৈশ্বিক উন্নয়ন থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, তাই আমাদেরও এ উন্নয়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে উন্নয়নের প্রধান শর্ত হলো, দেশের সার্বিক উন্নয়নে তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ ও যথার্থ উন্নয়নমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করা। তথ্যপ্রযুক্তির নানা দিক: তথ্য প্রয়োগ বা ব্যবহার এবং সংরক্ষণ ও প্রচারের কৌশলকে বলা হয় তথ্যপ্রযুক্তি (Information Technology)। বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তি বলতে যে বিষয়টিকে বোঝানো হয় তা নির্ভর করে কম্পিউটারের কার্যক্ষমতার ওপর। সারা পৃথিবীর অসংখ্য কম্পিউটারকে জালের মতো জুড়ে দেওয়া হয়- একে বলা হয় কম্পিউটার নেটওয়ার্ক। এ সব কম্পিউটারের মধ্যে তথ্য আদানপ্রদান হয় অদৃশ্য এক আলোকতরঙ্গ সংকেতের মাধ্যমে। আলোর গতিকে ব্যবহার করে বলে কম্পিউটারে তথ্য সরবরাহের কাজ অত্যন্ত দ্রুতগতিতে সম্পন্ন হয়। ফলে পৃথিবীর প্রত্যন্ত অঞ্চলেও কোনো তথ্য সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে পৌঁছে যেতে পারে। মূলত তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে তথ্য সরবরাহে এসেছে অভূতপূর্ব গতি। ফলে সমস্ত পৃথিবীর কর্মপদ্ধতিও হয়ে উঠেছে দ্রুতগতিসম্পন্ন। তথ্যপ্রযুক্তির প্রায়োগিক দিক: তথ্যপ্রযুক্তির একটি প্রায়োগিক দিকের কথা আমরা মোটামুটি সবাই জানি- এটি হচ্ছে ইন্টারনেট। তবে তথ্যপ্রযুক্তি শুধু ইন্টারনেটেই সীমাবদ্ধ নয়। তথ্যপ্রযুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে ইন্টারনেট বিবেচ্য। সাধারণ তথ্যের জন্য এখন ইন্টারনেটের কোনো বিকল্প নেই। মানুষ তার দৈনন্দিন জীবনের সব খবরাখবর ইন্টারনেট থেকে নেয়। শুধু যে বাস, ট্রেন বা প্লেনের সময়সূচি ইন্টারনেটে পাওয়া যায় তা নয়, সেগুলোর টিকিটও ইন্টারনেট থেকে কেনা যায়। পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষ এখন সত্যিকার খবরের কাগজ না পড়ে ইন্টারনেটের খবর পড়ে। গবেষণার জার্নাল এখন ইন্টারনেটে প্রকাশ করা হয়। কেনাকাটার সবচেয়ে বড়ো পদ্ধতি এখন ইন্টারনেট। রেডিও, টেলিভিশন আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার করে সেগুলো ইন্টারনেটে তাদের অনুষ্ঠান প্রচার করে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার করা হচ্ছে। শুধু তথ্য আদানপ্রদান ও সংরক্ষণে এখন তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার সীমাবদ্ধ নয়। এ কারণে ইন্টারনেটে তথ্য বিনিময়ের পাশাপাশি বিজ্ঞানী ও গবেষকরা সেটাকে গবেষণার কাজেও ব্যবহার করছেন। অর্থাৎ সরল কিংবা জটিল, সহজ কিংবা কঠিন, গুরুত্বপূর্ণ কিংবা তুচ্ছ- সব কাজেই এখন তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার করা হচ্ছে। যত দিন যাচ্ছে, এর ব্যবহার ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। একথা মোটামুটি নিশ্চিতভাবে বলা যায়, যারা তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লব থেকে বিচ্ছিন্ন তারা জোর কদমে ছুটে চলা পৃথিবীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারবে না। দ্রুতই তারা পিছিয়ে পড়বে। তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন: ২০০৬ সাল থেকে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট সুপার হাইওয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সমুদ্র তলদেশের সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে। কিন্তু একটিমাত্র সাবমেরিন ক্যাবল প্রায়ই সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। বিশ্বায়নের ফলে আরও ভালোভাবে বলতে গেলে বিশ্বব্যাপী তথ্যপ্রযুক্তি দ্রুত প্রসারের ফলে বাংলাদেশ বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছে। আজ তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড়ো সাফল্য মোবাইল ফোনের ব্যবহার। এটি বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে এনেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। তবে তথ্যপ্রযুক্তির অন্যান্য ক্ষেত্রে আমাদের অর্জন জ্ঞানভিত্তিক সমাজব্যবস্থা থেকে অনেক দূরে। শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার ও বাংলাদেশ: সময়ের বিবর্তনে বর্তমানে প্রযুক্তিগত শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জনেও প্রযুক্তিগত শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ১৭ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে ৭০ শতাংশের বয়স ৩৫ বছরের বেশি। তথ্য ও প্রযুক্তিগত সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে দেশের এ বিপুল জনগোষ্ঠী পালন করতে পারে অগ্রণী ভূমিকা। এ লক্ষ্যে, দেশে নিরক্ষরতা দূর করে স্বাক্ষরতার হার শতভাগ অর্জনে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ষষ্ঠ জ জাতীয় জনশুমারি ও গৃহগণনা অনুযায়ী দেশে সাক্ষরতা হার ৫১.৭৭ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৪.৬৬ শতাংশ। পাশাপাশি যুযোগপযোগী শিক্ষানীতি ও মানবসম্পদ উন্নয়ন কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে। দেশের জনশক্তিকে জ্ঞানবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত শিক্ষায় শিক্ষিত করে সমৃদ্ধ মানবপুঁজি হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার বদ্ধপরিকর। এ লক্ষ্যে বাস্তবায়ন করা হয়েছে আইসিটি মাস্টারপ্ল্যান (২০১২-২০২১)। 'ইন্ট্রাডাকশন অব এডুকেশন অ্যাট সেকেন্ডারি অ্যান্ড হায়ার সেকেন্ডারি লেভেল থু আইসিটি' প্রকল্পের মাধ্যমে ২০ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইন্টারনেট সংযোগ প্রদানসহ একটি করে ল্যাপটপ ও মাল্টিমিডিয়া প্রদান করা হয়েছে। 'একসেস টু ইনফরমেশন' প্রোগ্রাম-এর সহযোগিতায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক ১৫ হাজার ৫০০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৫ হাজার মাদ্রাসা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক ১ হাজার ৫১৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম অনলাইনে ম্যানেজমেন্ট ও মনিটরিং করার জন্য ড্যাশবোর্ড তৈরি করা হয়েছে। প্রাথমিক, মাধ্যমিক, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের ৩২৫টি পাঠ্যপুস্তক এবং ১০০টিরও অধিক সহায়ক বই ই-বুকে রূপান্তর করা হয়েছে। www.ebook.gov.bd ওয়েবসাইট থেকে এসব ই-বুক পড়া, ডাউনলোড ও প্রিন্ট করা যাচ্ছে। বর্তমানে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসম্পন্ন কম্পিউটার ল্যাব ও ল্যাঙ্গুয়েজ ল্যাব প্রতিষ্ঠার কাজ চলছে। এক সঙ্গে চলমান রয়েছে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল ল্যাবরেটরি নির্মাণের প্রকল্পও। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের উন্নয়নে তথ্যপ্রযুক্তির ভূমিকা: কোনো একটি দেশের সরকারি, আধা-সরকারি, বেসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাজে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার সে দেশের সার্বিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে। বাংলাদেশের উন্নয়নেও তথ্যপ্রযুক্তি অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। অভ্যন্তরীণ ও আন্তঃদেশীয় তথ্য আদানপ্রদানে তথ্যপ্রযুক্তি ভূমিকা রাখছে। আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে সক্রিয় যোগাযোগ স্থাপিত হওয়ায় দেশের জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। শিক্ষার ক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির প্রভাব অনস্বীকার্য। এর ব্যবহারে বাংলাদেশের কোনো ছাত্র ইচ্ছা করলে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ইউরোপ-আমেরিকার বিখ্যাত বইগুলোর সাহায্য নিতে পারে। তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে স্বাস্থ্যক্ষেত্রেও এসেছে উন্নয়নের ছোঁয়া। ওপেন হার্ট সার্জারিসহ অনেক অত্যাধুনিক চিকিৎসা বাংলাদেশে সফলভাবে দেওয়া এখন সম্ভব। যার পিছনে তথ্যপ্রযুক্তির শক্তিশালী প্রভাব বিদ্যমান। বাংলাদেশের ব্যাবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার ব্যাবসাকে আরও বেশি লাভজনক করে তুলেছে। বিদেশের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন সহজতর হয়েছে বলেই এ পরিবর্তন। এছাড়া বাংলাদেশের সকল সরকারি হিসাবনিকাশের ক্ষেত্রে যেমন: আয়-ব্যয়ের হিসাব, কর আদায়ের হিসাব প্রভৃতি ক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে, পারলে সর্বক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের অন্যতম সমস্যা 'দুর্নীতি' দূর করা সম্ভব। অর্থাৎ দেশের সকল কার্যাবলিতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং তা প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে দিতে পারলে দেশের সার্বিক উন্নয়নে তা ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারবে। উপসংহার: ২০০ বছর আগে পৃথিবীতে শিল্পবিপ্লব হয়েছিল। যারা সেই শিল্পবিপ্লবে অংশ নিয়েছিল তারা পৃথিবীটাকে শাসন করেছে। ঠিক এই মুহূর্তে শিল্পবিপ্লবের মতোই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লব ঘটছে- যারা এ বিপ্লবে অংশ নেবে তারাই নতুন পৃথিবীর নেতৃত্ব দেবে। বাংলাদেশকে পৃথিবীর সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড় করানোর জন্য নতুন প্রজন্ম তথ্যপ্রযুক্তিতে নিজেদের দক্ষ করে তুলবে- এটা সবারই প্রত্যাশা।
HSC Bangla 2nd Paper প্রবন্ধ-নিবন্ধ রচনা CQ — Prosthuti প্রশ্নব্যাংক
HSC · Bangla 2nd Paper · প্রবন্ধ-নিবন্ধ রচনা · সৃজনশীল
তথ্যপ্রযুক্তি ও বাংলাদেশ ( রা. বো. ২৫; কু. বো. ২৪; য. বো. ২৪; ঘ. বো. ১৯; চ. বো. ১৯; সি. বো. ১৯; রা. বো. ১৭; ঢাকা ইমপিরিয়াল কলেজ; ময়মনসিংহ গার্লস ক্যাডেট কলেজ )
উত্তর