স্বদেশপ্রেম (মি. বো. ২৫; রা. রো. ১৭; দি. বো. ১৯, ১৭; ব. বো. ১৭; দি. বো. ২৪, ১৩, ০৯; কু. বো. ২৪, ১০; সি. বো. ১৯, ১৪; চ. বো. ১৯, ১৬; য. বো. ২৫, ২৪, ১৬, ১২; ঢাকা কলেজ; আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মতিঝিল, ঢাকা; রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, ঢাকা; মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ, ঢাকা; বাংলাদেশ বিমান বাহিনী শাহীন কলেজ, ঢাকা।)
উত্তর: স্বদেশপ্রেম মা, তোর বদনখানি মলিন হলে, ও মা, আমি নয়ন জলে ভাসি। আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি। -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভূমিকা: স্বদেশের প্রতি হৃদয় নিংড়ানো ভাবাবেগের স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ আমাদের দেশাত্মবোধ যা আমাদের অস্তিত্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পরিচায়ক। স্বদেশপ্রেম মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। প্রতিটি মানুষের জন্মলগ্ন থেকেই জন্মভূমির সঙ্গে গড়ে ওঠে নাড়ির সম্পর্ক। স্বদেশের প্রতি জন্ম নেয় অকৃত্রিম মমত্ববোধ। দেশমাতৃকার বিশাল ও বিস্তৃত আঙিনা প্রত্যেক মানুষের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। স্বদেশপ্রেমের মাধ্যমেই মানুষের ব্যক্তিত্বের পূর্ণ বিকাশ ঘটে। স্বদেশপ্রেমের স্বরূপ/স্বদেশপ্রেম কী: প্রত্যেক মানুষ যে দেশে জন্মগ্রহণ করে তাকে তার জন্মভূমি বা স্বদেশ বলা হয়। জন্মভূমির মাটি, আলো-বাতাস, অন্ন-জলের প্রতি মানুষের মমত্ববোধ অপরিসীম। জন্মভূমির ভাষা, সাহিত্য-সংস্কৃতি, ঐতিহ্যের সঙ্গে গড়ে ওঠে মানুষের শিকড়ের বন্ধন। স্বদেশের প্রকৃতি ও মানুষের প্রতি এই অনুরাগ ও বন্ধনের নামই স্বদেশপ্রেম। মা, মাতৃভূমি আর মাতৃভাষার প্রতি গভীর অনুরাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটে স্বদেশপ্রেমের মাধ্যমে। স্বদেশপ্রেম হলো নিজের দেশের প্রতি, জাতির প্রতি, ভাষার প্রতি গভীর আকর্ষণ অনুভব করা। দেশের প্রতি প্রবল অনুরাগ, নিবিড় ভালোবাসা এবং যথার্থ আনুগত্যকে দেশপ্রেম বা স্বদেশপ্রেম বলে। স্বদেশপ্রেমের উৎস: প্রত্যেক মানুষ নিজেকে ভালোবাসে আর নিজের প্রতি ভালোবাসা থেকে জন্ম নেয় স্বদেশের প্রতি ভালোবাসা। প্রতিটি জীবের ভেতরেই এই গুণ বিদ্যমান। পশু যেমন বনভূমি ছেড়ে লোকালয়ে ছটফট করে আবার পাখিকে নীড়চ্যুত করলে তার মর্মভেদী আর্তনাদ বাতাস ভারি করে তোলে। এটি হয় নিজ আবাসের প্রতি ভালোবাসা থেকে। আর নিজ আবাসের প্রতি ভালোবাসা থেকেই জন্ম নেয় স্বদেশের প্রতি ভালোবাসা। স্বদেশপ্রেমের বৈশিষ্ট্য: জন্মলগ্ন থেকেই মানুষ স্বদেশের আলো-বাতাস, মাটি, পানি, বায়ু দ্বারা পুষ্ট হয়ে থাকে। দেশের প্রতি আনুগত্য, নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে চলা, আত্মত্যাগ, বীরত্বগাথা, কৃতজ্ঞতা, সততা, সরলতা, দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধের মাধ্যমেই ফুটে ওঠে সত্যিকারের দেশপ্রেম। স্বদেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ: স্বদেশের প্রতি আমাদের ভালোবাসা প্রকাশ পায় স্বদেশের বিপর্যয়ের মুহূর্তে। দেশের দুর্দিনে দেশপ্রেমের পূর্ণ বিকাশ ঘটে। স্বদেশের পরাধীনতায়, স্বদেশের প্রতি হামলায়, স্বদেশের মুখে কলঙ্ক লেপনের সময় মানুষের ভিতরে স্বদেশপ্রীতি মূর্ত হয়ে ওঠে। তখন জন্মভূমি জননীন মতো সন্তানের দিকে কাতর নয়নে তাকায় আর জননীর বেদনায় সন্তানের হৃদয় হয় বিদীর্ণ। স্বদেশের স্বাধীনতা রক্ষায় তখন জীবন দিতেও সে কুণ্ঠাবোধ করে না। জলের মাছকে ডাঙায় তুললে যেমন মাছ জলের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারে তেমনি প্রবাস জীবনেও মানুষের ভেতর স্বদেশপ্রেম মূর্ত হয়ে ওঠে। ছাত্রজীবনে স্বদেশপ্রেমের শিক্ষা: ছাত্ররাই দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ কর্ণধার। দেশের উন্নতি ও জাতির আশা পূরণের আশ্রয়স্থল। তাই-দেশ ও জাতির প্রতি গভীর মমত্ববোধ ছাত্রজীবনেই জাগিয়ে তুলতে হবে। দেশকে ভালোবাসার জীবনমন্ত্রে দীক্ষিত হতে হবে। ছাত্রদের দেশপ্রেমের মন্ত্রে উজ্জ্বীবিত করতে পারলেই দেশের স্বার্থে প্রয়োজনে জীবন উৎসর্গ করার আগ্রহ সৃষ্টি হবে। স্বদেশপ্রেম ইমানের অঙ্গ: স্বদেশপ্রেম সৃষ্টিকর্তার প্রেমেরই নামান্তর। হজরত মুহম্মদ (স.) বলেছেন, 'স্বদেশপ্রেম ইমানের অঙ্গ।' যে ব্যক্তি দেশকে শ্রদ্ধার চোখে দেখে না, দেশের গৌরবে গৌরবান্বিত হয় না, দেশবাসীর দুঃখ অনুভব করে না, সে সত্যিকারের দেশপ্রেমিক হতে পারে না। পৃথিবীর সকল ধর্মেই স্বদেশপ্রেমকে উৎসাহিত করা হয়েছে। মহামানবদের স্বদেশপ্রেম: পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত যত মহামানবের জন্ম হয়েছে, তারা প্রত্যেকেই ছিলেন স্বদেশ ও স্বজাতির প্রতি নিবেদিত প্রাণ। ইসলামের নবি হজরত মুহম্মদ (স.) তাঁর জন্মস্থান মক্কাকে অসম্ভব ভালবাসতেন। হিজরতের সময় তিনি বারবার মক্কার দিকে পিছন ফিরে তাকিয়েছেন এবং বলেছেন, 'প্রিয় মক্কা! আমি তোমাকে ছেড়ে যেতাম না-যদি তারা আমাকে বাধ্য না করতো। স্বদেশপ্রেমের উপায়: ''স্বদেশের উপকারে নাই যার মন কে বলে মানুষ তারে পশু সেই জন।'' স্বীয় দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালনের মধ্যেই দেশপ্রেম নিহিত। জাতির জন্য, দেশের জন্য, প্রত্যেক মানুষের জন্য কিছু না কিছু করার আছে। কৃষক শস্য উৎপাদন বাড়িয়ে, সাহিত্যিক তাঁর সাহিত্য রচনার মাধ্যমেও দেশের প্রতি ভালোবাসা জ্ঞাপন করতে পারেন। স্বদেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হতে হলে মানুষকে ভালোবাসতে হবে। নিজের দৈন্যদশা তুচ্ছ করতে হবে এবং দেশ ও জাতির কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করতে হবে। দেশপ্রেমের প্রায়োগিক ক্ষেত্রসমূহ: দেশপ্রেম কেবল একটা ধারণা নয়। এটি চিন্তাচেতনা, ধ্যানধারণা লালনের বিষয়। কাজে-কর্মে, আচার-আচরণে, চলনেবলনে, পোশাক-পরিচ্ছদে দেশপ্রেম জাগিয়ে তোলা যায়। সামাজিক আচার-আচরণে দেশজ সংস্কৃতির প্রতি খেয়াল রাখতে হবে। বিশ্বায়নের স্রোতে তাল মেলানোর ঠুনকো অজুহাতে দেশজ সংস্কৃতি ভুলে বিজাতীয় সংস্কৃতিকে আকড়ে ধরলে হবে না। সাংস্কৃতিক বলয়ে থেকে দেশপ্রেম প্রয়োগ করতে হবে। দেশপ্রেম ও বিশ্বপ্রেম: ''স্বদেশপ্রেম থেকে বিশ্বপ্রেম, যে নিজের দেশকে ভালোবাসে, সে বিশ্বপ্রেমিক মানবপ্রেমিক মানবতাবাদী'' স্বদেশপ্রেম বিশ্বপ্রেমেরই একটি অংশ। তাই প্রকৃত দেশপ্রেম ও বিশ্বপ্রেমের কোনো বিরোধ নেই। একজন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক কখনো অন্য দেশের অকল্যাণের কথা চিন্তা করতে পারেন না। দেশপ্রেমই তাঁকে অপর দেশকে ও জাতিকে শ্রদ্ধা ও সম্মান করতে শেখায়। বিশ্বে স্বদেশপ্রেমের দৃষ্টান্ত: যুগে যুগে অসংখ্য মনীষী দেশের মানুষের কল্যাণে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। উপমহাদেশের মহাত্মা গান্ধী, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, রাশিয়ার লেনিন ও স্ট্যালিন, ইতালির গ্যারিবল্ডি, আমেরিকার জর্জ ওয়াশিংটন, ভিয়েতনামের হো-চি-মিন, চীনের মাও সে তুং প্রমুখ ব্যক্তিগণ সারা বিশ্বে স্বদেশপ্রেমের ক্ষেত্রে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। উপসংহার: মাতৃভূমি জননীর সমতুল্য আর বৃহত্তর অর্থে মানুষ ধরিত্রীর সন্তান। আমাদের স্বদেশপ্রেমের নেপথ্যে রয়েছে লক্ষ-লক্ষ শহিদের আত্মত্যাগ, মা-বোনের সম্ভ্রম ও শত সহস্র রক্তের ঋণ যা আমাদের স্বদেশ ও স্বাধীনতা রক্ষার অনুপ্রেরণা ও দিশারি হয়ে কাজ করবে। স্বদেশপ্রেম আমাদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করুক আর যুগে যুগে আমাদের প্রাণে অণুরিত হোক- ''ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকায় মাথা।''
HSC Bangla 2nd Paper প্রবন্ধ-নিবন্ধ রচনা CQ — Prosthuti প্রশ্নব্যাংক
HSC · Bangla 2nd Paper · প্রবন্ধ-নিবন্ধ রচনা · সৃজনশীল
স্বদেশপ্রেম (মি. বো. ২৫; রা. রো. ১৭; দি. বো. ১৯, ১৭; ব. বো. ১৭; দি. বো. ২৪, ১৩, ০৯; কু. বো. ২৪, ১০; সি. বো. ১৯, ১৪; চ. বো. ১৯, ১৬; য. বো. ২৫, ২৪, ১৬, ১২; ঢাকা কলেজ; আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মতিঝিল, ঢাকা; রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, ঢাকা; মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ, ঢাকা; বাংলাদেশ বিমান বাহিনী শাহীন কলেজ, ঢাকা।)
উত্তর