উক্ত ঘটনাটি অর্থাৎ মহান ভাষা আন্দোলন বাঙালি জনগোষ্ঠীকে সর্বপ্রথম বাঙালি জাতীয়তাবাদে উদ্দীপ্ত করে তোলে- উক্তিটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।ভাষা আন্দোলন পূর্ব বাংলার জনগণের মধ্যে এক নতুন জাতীয় চেতনার উন্মেষ ঘটায়। এ চেতনা ক্রমে ক্রমে পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিকে দুর্বল করে দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের জন্ম দেয় এবং বাঙালিদের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে জাগ্রত করে। তাই এটা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছিল বাংলাদেশের প্রথম গণচেতনার সুসংগঠিত বহিঃপ্রকাশ এবং পরবর্তীকালে শাসকচক্রের বিরুদ্ধে স্বাধিকার আন্দোলনের প্রথম বলিষ্ঠ পদক্ষেপ। বস্তুত পাকিস্তানের মাত্র ৩.২৭% লোকের ভাষা ছিল উর্দু। পক্ষান্তরে ৫৬% জনগণের ভাষা বাংলাকে উপেক্ষা বাঙালিরা স্বভাবতই মেনে নিতে চায়নি। এর সাথে তাদের জীবিকার্জনের প্রশ্নও জড়িত ছিল। শাসকদের ভাষা উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বেছে নেওয়ায় বাঙালিদের চাকরিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরও পিছিয়ে পড়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। এর সাথে যুক্ত ছিল রাজনীতিসহ সর্বত্র বাঙালিদেরকে বঞ্চিত করার পশ্চিমা মানসিকতা। এজন্য ভাষা আন্দোলন বাঙালিকে মুসলিম লীগের মুসলিম জাতীয়তাবাদ ও দ্বি-জাতিতত্ত্বভিত্তিক জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে সন্দিহান করে তোলে। তাই অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রথম পর্যায় হিসেবে বাঙালিরা বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠাকে বেছে নেয়। এ বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনাই ষাটের দশকে স্বৈরশাসন বিরোধী ও স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে আন্দোলনে প্রেরণা জোগায়। মহান ভাষা আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ হয়েই বাঙালি জাতি পাকিস্তান শাসকচক্রের প্রতিটি ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিতে সক্ষম হয় এবং পরিশেষে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম হয়। সুতরাং নিঃসন্দেহে বলা যায়, ঘটনাটি অর্থাৎ মহান ভাষা আন্দোলন বাঙালি জনগোষ্ঠীকে সর্বপ্রথম বাঙালি জাতীয়তাবাদে উদ্দীপ্ত করে তোলে- উক্তিটি যথার্থ ও সার্থক।