বাংলাদেশের কৃষক
উত্তর: ভূমিকা: শস্য শ্যামল বাংলার অর্থনীতির প্রধান উৎস কৃষি। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। এদেশের অধিকাংশ মানুষের জীবিকা কৃষির সাথে সম্পৃক্ত। কৃষকদের সীমাহীন শ্রম আর আত্মত্যাগের বিনিময়ে গড়ে উঠেছে এদেশের অর্থনৈতিক বুনিয়াদ। বাংলাদেশের কৃষি আর কৃষকদের কথা বাদ দিলে এদেশের অর্থনীতিকে অস্বীকার করা হয়। শুধু দেশীয় অর্থনীতিতেই কৃষকদের ভূমিকা সমাপ্ত নয়, জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতিতেও আছে কৃষকদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান। বাংলাদেশের কৃষক: কৃষি ব্যবস্থাপনাটি পৃথিবীর প্রাচীন পেশা হিসেবে স্বীকৃত। সভ্যতার উষালগ্নে কৃষিই ব্যাপক অবদান রেখেছিল। ফলে পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেই কমবেশি কৃষির বিস্তার ঘটেছিল। আর এ সূত্র ধরেই কৃষকদেরও বিস্তার হতে থাকে। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো শিল্প উৎপাদন থেকে তাদের জাতীয় আয় ও অর্থনীতিকে কল্পনা করে থাকে- কিন্তু তাই বলে কৃষিকে তারা বাদ দিয়ে ফেলেনি। উদাহরণ হিসেবে চীনের কথা বলা যেতে পারে। তাদের ইলেকট্রনিক সামগ্রীতে ছেয়ে আছে গোটা বিশ্ব। বলা চলে, এটিই তাদের অর্থনীতির প্রধান খাত। কিন্তু তাদের দেশের কৃষকদের অবস্থা অনেক উন্নত, গুরুত্বও অনেক বেশি। তাদের দেশের কৃষকদের কৃষিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাহচর্য তাদের অনেক বেশি আধুনিক করে রেখেছে। সেদিক থেকে বাংলাদেশের কৃষকদের অবস্থা খুব একটা সন্তোষজনক নয়। বাংলাদেশের কৃষক বলতে বোঝায় নিরক্ষর, রোগক্লিষ্ট ও ঋণভারে জর্জরিত অসহায় এক সম্প্রদায়কে। তারা পৃথিবীর জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রভূত উন্নতি সম্পর্কে বলা চলে অজ্ঞ। জীর্ণ-কুটিরে বাস করে হিসাব কষে বীজ রোপণের, ফসল কাটার। হালের গরু আর সেকেলে লাঙল-জোয়াল তাদের বেঁধেছে সহজ-সরল জীবনে। তাদের জীবনে উচ্চাশা বলতে কিছু নেই, বরং ক্ষুদ্র চাওয়াটুকু থেকেও তারা বঞ্চিত। উন্নত দেশসমূহের কৃষকরা প্রশংসিত আর বাংলাদেশের কৃষকরা অবহেলিত। বর্তমানে কিছুসংখ্যক আধুনিক যন্ত্রের দেখা মিললেও তা সন্তোষজনক নয়। কৃষকের গুরুত্ব: দেশের জাতীয় আয় ও অর্থনীতিতে কৃষি যে ভূমিকাপালন করে এর সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত এদেশের কৃষক। প্রয়োজনীয় খাদ্যের জোগান দিয়ে কৃষকরা আমাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। শস্য উৎপাদনে বাংলাদেশের কৃষকরা যদি সক্রিয় ভূমিকা পালন না করত তাহলে নিত্য দুর্ভিক্ষের মধ্য দিয়ে বিপন্ন হতো দেশের মানব অস্তিত্ব। বাংলাদেশের ৮০ শতাংশ খাদ্যশস্যের জোগান দেয় এদেশের কৃষক। একসময় সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হতো কৃষকের উৎপাদিত পাট থেকে। আজও পাটজাত দ্রব্যের সর্বাংশের জোগান আসে কৃষকদের হাত থেকেই। পুষ্টিহীনতা আমাদের দেশের একটি জাতীয় সমস্যা। বিশেষত গ্রামাঞ্চলের মানুষরা অপুষ্টিতে ভুগে। এ সমস্যা দূরীকরণে কৃষকরা প্রাণপণ চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। তাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য, শাকসবজি ও ফলমূল থেকে ভিটামিনের চাহিদা পূরণ করা হয়ে থাকে, যা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কৃষকরা যদি তাদের উৎপাদন বন্ধ করে দিত শুধু জনস্বাস্থ্যই হুমকির মুখে পড়ত না গভীর খাদ্য সংকটের মুখোমুখি হতে হতো মানুষের। মূলত কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে কৃষিই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ভরসা এবং আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূল কেন্দ্রবিন্দু। 'সব সাধকের বড় সাধক আমার দেশের চাষা,.. দেশ মাতারই মুক্তিকামী, দেশের সে যে আশা।' কৃষকের অতীত অবস্থা: বাংলাদেশের কৃষকদের অতীত অবস্থা ছিল অনেকটা রূপকথার মতো। গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ- এসব পরিচিত বচনগুলো রূপকথা মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে সেটিই ছিল একসময়ের কৃষকদের জীবনবাস্তবতা। অতীতে কৃষকদের আবাদি জমির পরিমাণ ছিল পর্যাপ্ত, মাটি ছিল উর্বর। মানুষ কম ছিল, চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি ছিল উৎপাদন। আজকের কৃষকরা মহাজনদের কাছে ঋণের দায়ে জর্জরিত, কিন্তু অতীতের কৃষকরা ঋণগ্রস্ত ছিল না, ছিল দুশ্চিন্তামুক্ত প্রফুল্ল জীবনের অধিকারী। কৃষকদের বর্তমান অবস্থা: বর্তমান বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষক ভূমিহীন। দেশে আবাদি জমির পরিমাণ দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে বিপরীতে কৃষিজমি ভরাট হচ্ছে যত্রতত্র। কৃষকরা অন্যের জমিতে বর্গা দিয়ে কোনো রকমে যাপন করছে তাদের জীবন। সার, কীটনাশকের মূল্য চড়া। কৃষকদের সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে অত্যাবশ্যক এ কৃষি উপাদান *। এমনকি টাকা দিয়ে যে সার কিনবে সে সার সরবরাহেও মাঝেমধ্যে বিঘ্ন ঘটে। সার চাইতে গিয়ে কৃষককে দিতে হয় চড়া মূল্য। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগে যেখানে কৃষক পাওয়ার কথা কলের লাঙল আর অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা সেখানে কৃষকরা পাচ্ছে না দুটি হালের বলদ। এ অবস্থা কাম্য হতে পারে না। প্রয়োজন কৃষকদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা, প্রয়োজন তাদের চাহিদাগুলোর পূরণ। কৃষকদের দুরবস্থার কারণ: আমাদের দেশের কৃষকরা কৃষিকাজ করে অভ্যাস বা পেশাগত পরম্পরা মেনে; কিন্তু তাদের বিজ্ঞাননির্ভর হওয়া জরুরি। কৃষকরা এখনো প্রাচীন পদ্ধতিতে চাষ করে বলে শ্রম বেশি হচ্ছে বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে কম। ত্রুটিপূর্ণ ভূমি ব্যবস্থাও আজকের কৃষকদের দূরবস্থার একটি বড়ো কারণ। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও কৃষকদের একটি বড়ো অংশের নিজস্ব ভূমি নেই। অন্যের জমিতে চাষ করে জমির মালিককে বর্গা দিয়ে কৃষক যা পায় তাতে তার স্বাভাবিক জীবন-যাপন করাই কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে দরিদ্র কৃষক দরিদ্রই থেকে যাচ্ছে আর মালিক-মহাজনরা স্থির বসে আছে মহাজনি কাজে। বন্যা, খরা, ঝড়, জলোচ্ছ্বাসসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়মিতই আঘাত করে এদেশের কৃষকদের। নিঃস্ব কৃষক নব উদ্যোমে আবারও ঘুরে দাঁড়ায় আর আমরা কাটাই নির্ঝঞ্ঝাট জীবন। কৃষকদের উন্নতির উপায়: বাংলাদেশের কৃষকদের দুরবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে আরও সক্রিয় হতে হবে। স্থানে স্থানে কৃষকদের অত্যাধুনিক চাষবিষয়ক কর্মশালার আয়োজন করে কৃষকদের বিজ্ঞাননির্ভর করে তুলতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কৃষকদের রাষ্ট্র কর্তৃক মূলধন দিয়ে সহযোগিতা করা যেতে পারে। আধুনিক সেচব্যবস্থার প্রচলনকে সম্প্রসারণ করতে হবে এবং কৃষকদের কাছে তা পৌঁছতে হবে সাশ্রয়ী মূল্যে। সার, কীটনাশকসহ যাবতীয় কৃষিজ উপকরণ কৃষকদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে পারলে এটি হবে একটি বড়ো কাজ। বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকার এ ব্যাপারে বেশকিছু সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। মহাজনদের চড়া সুদের ঋণ থেকে কৃষককে রক্ষা করার জন্য কৃষি ব্যাংককে সচল রেখেছে। সময়ে সময়ে সারের জোগান দিয়ে সার আমদানি বা ক্রয় করে কৃষকদের প্রতি সরকারের সহায়তা অব্যাহত রেখেছে। কিন্তু সরকারকে এ ব্যাপারে আরও বেশি উদার হতে হবে, হতে হবে কৃষকদের প্রতি আন্তরিক। উপসংহার: বাংলাদেশের কৃষক বাঁচলে অর্থনীতি বাঁচবে। কৃষক বেশি উৎপাদন করতে পারলে জাতীয় উন্নয়ন 'ত্বরান্বিত হবে। তাই বাংলাদেশের কৃষকদের উন্নয়নে দরকার যুগান্তকারী পদক্ষেপ ও কৃষক বান্ধব সরকার, তবেই সুদৃঢ় হবে দেশের অর্থনৈতিক বুনিয়াদ।
SSC বাংলা ২য় পত্র পরিচ্ছেদ ৪৯ : প্রবন্ধ রচনা CQ — Prosthuti প্রশ্নব্যাংক
SSC · বাংলা ২য় পত্র · পরিচ্ছেদ ৪৯ : প্রবন্ধ রচনা · সৃজনশীল
বাংলাদেশের কৃষক
উদ্দীপক
Comilla · 2020
উত্তর
খুব কাছ থেকে শিশুকে নৈতিক চরিত্রের শিক্ষাদান পরিবারের পক্ষেই সম্ভব। সৎ সঙ্গ শিশুর প্রতিভা বিকাশে সহায়ক। সকল নিষ্ঠুরতা থেকে শিশুকে দূরে সরিয়ে রাখতে হবে। সৃষ্টিশীল কাজে শিশুকে উৎসাহিত করতে হবে। এভাবেই, চরিত্র বিকাশে পরিবার পালন করে প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তবে শিশুর চরিত্র গঠনে শিক্ষক-শিক্ষিকাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
চরিত্র গঠনে সমাজের ভূমিকা: চরিত্র গঠনে সমাজের ভূমিকাও অনস্বীকার্য। বিশেষত শৈশবে চরিত্র বিকাশে সমাজ-পরিমণ্ডল পালন করে অন্যতম সহায়ক ভূমিকা। পাড়া-প্রতিবেশী, সমবয়সি সঙ্গী-সাথী সবার সাথে মানবজীবন অতিবাহিত হয়। তাই এদের সবার প্রভাবেই গড়ে ওঠে ব্যক্তি চরিত্র। ফলে সামাজিক জীবনাচার যেন সৎ ও সুন্দর গুণাবলির সমন্বয়ে গঠিত হয় তার দিকে দৃষ্টি রাখতে হবে সবাইকে।
শিক্ষার মাধ্যমে চরিত্র গঠন: শিক্ষা শুধু জ্ঞানার্জনেই সহায়তা করে না, উন্নত চরিত্র গঠনেও সাহায্য করে। উন্নত চরিত্র গঠনের জন্য প্রাণশক্তি, সাহস, সংবেদনশীলতা ও বুদ্ধির সমন্বয় প্রয়োজন। শিক্ষার মাধ্যমে ব্যক্তির মধ্যে এ বৈশিষ্ট্যগুলোর সঞ্চার করা হয়। পাঠ-প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীর মনে সাবলীলভাবে বেঁচে থাকার প্রেরণা জোগানো হয় এবং জীবনীশক্তির সঞ্চার করা হয়। জীবনের প্রতি জাগ্রত আগ্রহ ব্যক্তির সুস্থ মানসিকতা গঠনে সহায়তা করে। আবার শিক্ষার মাধ্যমে ব্যক্তি আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। ফলে নিজের বিচার বিবেচনা দ্বারা আচরণবিধি তৈরি করে। ব্যক্তি অর্জন করে উদার দৃষ্টিভঙ্গি। চিন্তার ক্ষেত্রে এ দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্তিকে ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। এভাবেই শিক্ষা ব্যক্তির উন্নত চরিত্র গঠনে সহায়তা করে।
চরিত্রহীনতার কুফল: মানবজীবনের সর্বোৎকৃষ্ট সম্পদ চরিত্র। চরিত্রহীন ব্যক্তির মনে আশ্রয় নেয় অশুভ চিন্তা। আত্মচিন্তায় বিভোর ব্যক্তি লোভ-লালসায় মত্ত হয়ে পড়ে। যেকোনো পাপ কাজ করতে তার অন্তর কাঁপে না। তারা সমাজ ও দেশের কলঙ্ক। সবার ঘৃণাই তাদের পাথেয়। যতই বিত্তশালী হোক না কেন চরিত্রহীন মানুষ কখনোই কারও শ্রদ্ধা-ভালোবাসা পায় না। তাদের জীবন পশুর জীবনের চেয়েও নিকৃষ্ট।
মহৎ চরিত্রের দৃষ্টান্ত: চরিত্রশক্তিতে বলীয়ান ব্যক্তিগণ অমরত্ব নিয়ে মানব মনে বেঁচে থাকে চিরকাল। অন্যায়, অসত্য ও পাপের বিরুদ্ধে এসব মহৎ ব্যক্তির দৃঢ় অবস্থান অক্ষয় ঔজ্জ্বল্য নিয়ে আলোকিত করে সবাইকে। তারা ধনসম্পদে সমৃদ্ধ না হলেও গৌরবৌশ্বর্যে মহীয়ান। এমনই চরিত্রের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হযরত মুহম্মদ (স.), যীশুখ্রিষ্ট, গৌতমবুদ্ধ, বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায়, মহাত্মা গান্ধী, মওলানা ভাসানী, হাজী মুহম্মদ মুহসীন প্রমুখ। এরা সবাই মানবব্রতী, দেশব্রতী, উন্নত ও মহৎ চরিত্রের অধিকারী।
উপসংহার: দিকে দিকে আজ অমঙ্গলের প্রভাব পরিলক্ষিত। মানুষের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা যেন বিলুপ্ত। বিশ্বব্যাপী আজ বেড়েছে ভোগ করার প্রবণতা এবং কমেছে মূল্যবোধ। এমতাবস্থায় চরিত্রের নবজাগরণ একান্ত প্রয়োজন। কেননা, চরিত্রবান নাগরিকই অনৈতিকতার অন্ধকার থেকে জাতীয় জীবনকে রক্ষা করতে পারবে। চরিত্রের মহিমায় মানুষকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে মূল্যবোধ। কবির কণ্ঠে মহৎ চরিত্র গঠনের বাণী
শোনা যায়-
'এমন জীবন হবে 'করিতে গঠন
হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভুবন।' মরণে হাসিবেউত্তর
উত্তর