শেয়ারFacebookWhatsApp

বাংলাদেশের কৃষক

উত্তর: ভূমিকা: শস্য শ্যামল বাংলার অর্থনীতির প্রধান উৎস কৃষি। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। এদেশের অধিকাংশ মানুষের জীবিকা কৃষির সাথে সম্পৃক্ত। কৃষকদের সীমাহীন শ্রম আর আত্মত্যাগের বিনিময়ে গড়ে উঠেছে এদেশের অর্থনৈতিক বুনিয়াদ। বাংলাদেশের কৃষি আর কৃষকদের কথা বাদ দিলে এদেশের অর্থনীতিকে অস্বীকার করা হয়। শুধু দেশীয় অর্থনীতিতেই কৃষকদের ভূমিকা সমাপ্ত নয়, জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতিতেও আছে কৃষকদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান। বাংলাদেশের কৃষক: কৃষি ব্যবস্থাপনাটি পৃথিবীর প্রাচীন পেশা হিসেবে স্বীকৃত। সভ্যতার উষালগ্নে কৃষিই ব্যাপক অবদান রেখেছিল। ফলে পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেই কমবেশি কৃষির বিস্তার ঘটেছিল। আর এ সূত্র ধরেই কৃষকদেরও বিস্তার হতে থাকে। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো শিল্প উৎপাদন থেকে তাদের জাতীয় আয় ও অর্থনীতিকে কল্পনা করে থাকে- কিন্তু তাই বলে কৃষিকে তারা বাদ দিয়ে ফেলেনি। উদাহরণ হিসেবে চীনের কথা বলা যেতে পারে। তাদের ইলেকট্রনিক সামগ্রীতে ছেয়ে আছে গোটা বিশ্ব। বলা চলে, এটিই তাদের অর্থনীতির প্রধান খাত। কিন্তু তাদের দেশের কৃষকদের অবস্থা অনেক উন্নত, গুরুত্বও অনেক বেশি। তাদের দেশের কৃষকদের কৃষিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাহচর্য তাদের অনেক বেশি আধুনিক করে রেখেছে। সেদিক থেকে বাংলাদেশের কৃষকদের অবস্থা খুব একটা সন্তোষজনক নয়। বাংলাদেশের কৃষক বলতে বোঝায় নিরক্ষর, রোগক্লিষ্ট ও ঋণভারে জর্জরিত অসহায় এক সম্প্রদায়কে। তারা পৃথিবীর জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রভূত উন্নতি সম্পর্কে বলা চলে অজ্ঞ। জীর্ণ-কুটিরে বাস করে হিসাব কষে বীজ রোপণের, ফসল কাটার। হালের গরু আর সেকেলে লাঙল-জোয়াল তাদের বেঁধেছে সহজ-সরল জীবনে। তাদের জীবনে উচ্চাশা বলতে কিছু নেই, বরং ক্ষুদ্র চাওয়াটুকু থেকেও তারা বঞ্চিত। উন্নত দেশসমূহের কৃষকরা প্রশংসিত আর বাংলাদেশের কৃষকরা অবহেলিত। বর্তমানে কিছুসংখ্যক আধুনিক যন্ত্রের দেখা মিললেও তা সন্তোষজনক নয়। কৃষকের গুরুত্ব: দেশের জাতীয় আয় ও অর্থনীতিতে কৃষি যে ভূমিকাপালন করে এর সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত এদেশের কৃষক। প্রয়োজনীয় খাদ্যের জোগান দিয়ে কৃষকরা আমাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। শস্য উৎপাদনে বাংলাদেশের কৃষকরা যদি সক্রিয় ভূমিকা পালন না করত তাহলে নিত্য দুর্ভিক্ষের মধ্য দিয়ে বিপন্ন হতো দেশের মানব অস্তিত্ব। বাংলাদেশের ৮০ শতাংশ খাদ্যশস্যের জোগান দেয় এদেশের কৃষক। একসময় সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হতো কৃষকের উৎপাদিত পাট থেকে। আজও পাটজাত দ্রব্যের সর্বাংশের জোগান আসে কৃষকদের হাত থেকেই। পুষ্টিহীনতা আমাদের দেশের একটি জাতীয় সমস্যা। বিশেষত গ্রামাঞ্চলের মানুষরা অপুষ্টিতে ভুগে। এ সমস্যা দূরীকরণে কৃষকরা প্রাণপণ চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। তাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য, শাকসবজি ও ফলমূল থেকে ভিটামিনের চাহিদা পূরণ করা হয়ে থাকে, যা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কৃষকরা যদি তাদের উৎপাদন বন্ধ করে দিত শুধু জনস্বাস্থ্যই হুমকির মুখে পড়ত না গভীর খাদ্য সংকটের মুখোমুখি হতে হতো মানুষের। মূলত কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে কৃষিই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ভরসা এবং আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূল কেন্দ্রবিন্দু। 'সব সাধকের বড় সাধক আমার দেশের চাষা,.. দেশ মাতারই মুক্তিকামী, দেশের সে যে আশা।' কৃষকের অতীত অবস্থা: বাংলাদেশের কৃষকদের অতীত অবস্থা ছিল অনেকটা রূপকথার মতো। গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ- এসব পরিচিত বচনগুলো রূপকথা মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে সেটিই ছিল একসময়ের কৃষকদের জীবনবাস্তবতা। অতীতে কৃষকদের আবাদি জমির পরিমাণ ছিল পর্যাপ্ত, মাটি ছিল উর্বর। মানুষ কম ছিল, চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি ছিল উৎপাদন। আজকের কৃষকরা মহাজনদের কাছে ঋণের দায়ে জর্জরিত, কিন্তু অতীতের কৃষকরা ঋণগ্রস্ত ছিল না, ছিল দুশ্চিন্তামুক্ত প্রফুল্ল জীবনের অধিকারী। কৃষকদের বর্তমান অবস্থা: বর্তমান বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষক ভূমিহীন। দেশে আবাদি জমির পরিমাণ দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে বিপরীতে কৃষিজমি ভরাট হচ্ছে যত্রতত্র। কৃষকরা অন্যের জমিতে বর্গা দিয়ে কোনো রকমে যাপন করছে তাদের জীবন। সার, কীটনাশকের মূল্য চড়া। কৃষকদের সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে অত্যাবশ্যক এ কৃষি উপাদান *। এমনকি টাকা দিয়ে যে সার কিনবে সে সার সরবরাহেও মাঝেমধ্যে বিঘ্ন ঘটে। সার চাইতে গিয়ে কৃষককে দিতে হয় চড়া মূল্য। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগে যেখানে কৃষক পাওয়ার কথা কলের লাঙল আর অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা সেখানে কৃষকরা পাচ্ছে না দুটি হালের বলদ। এ অবস্থা কাম্য হতে পারে না। প্রয়োজন কৃষকদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা, প্রয়োজন তাদের চাহিদাগুলোর পূরণ। কৃষকদের দুরবস্থার কারণ: আমাদের দেশের কৃষকরা কৃষিকাজ করে অভ্যাস বা পেশাগত পরম্পরা মেনে; কিন্তু তাদের বিজ্ঞাননির্ভর হওয়া জরুরি। কৃষকরা এখনো প্রাচীন পদ্ধতিতে চাষ করে বলে শ্রম বেশি হচ্ছে বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে কম। ত্রুটিপূর্ণ ভূমি ব্যবস্থাও আজকের কৃষকদের দূরবস্থার একটি বড়ো কারণ। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও কৃষকদের একটি বড়ো অংশের নিজস্ব ভূমি নেই। অন্যের জমিতে চাষ করে জমির মালিককে বর্গা দিয়ে কৃষক যা পায় তাতে তার স্বাভাবিক জীবন-যাপন করাই কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে দরিদ্র কৃষক দরিদ্রই থেকে যাচ্ছে আর মালিক-মহাজনরা স্থির বসে আছে মহাজনি কাজে। বন্যা, খরা, ঝড়, জলোচ্ছ্বাসসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়মিতই আঘাত করে এদেশের কৃষকদের। নিঃস্ব কৃষক নব উদ্যোমে আবারও ঘুরে দাঁড়ায় আর আমরা কাটাই নির্ঝঞ্ঝাট জীবন। কৃষকদের উন্নতির উপায়: বাংলাদেশের কৃষকদের দুরবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে আরও সক্রিয় হতে হবে। স্থানে স্থানে কৃষকদের অত্যাধুনিক চাষবিষয়ক কর্মশালার আয়োজন করে কৃষকদের বিজ্ঞাননির্ভর করে তুলতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কৃষকদের রাষ্ট্র কর্তৃক মূলধন দিয়ে সহযোগিতা করা যেতে পারে। আধুনিক সেচব্যবস্থার প্রচলনকে সম্প্রসারণ করতে হবে এবং কৃষকদের কাছে তা পৌঁছতে হবে সাশ্রয়ী মূল্যে। সার, কীটনাশকসহ যাবতীয় কৃষিজ উপকরণ কৃষকদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে পারলে এটি হবে একটি বড়ো কাজ। বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকার এ ব্যাপারে বেশকিছু সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। মহাজনদের চড়া সুদের ঋণ থেকে কৃষককে রক্ষা করার জন্য কৃষি ব্যাংককে সচল রেখেছে। সময়ে সময়ে সারের জোগান দিয়ে সার আমদানি বা ক্রয় করে কৃষকদের প্রতি সরকারের সহায়তা অব্যাহত রেখেছে। কিন্তু সরকারকে এ ব্যাপারে আরও বেশি উদার হতে হবে, হতে হবে কৃষকদের প্রতি আন্তরিক। উপসংহার: বাংলাদেশের কৃষক বাঁচলে অর্থনীতি বাঁচবে। কৃষক বেশি উৎপাদন করতে পারলে জাতীয় উন্নয়ন 'ত্বরান্বিত হবে। তাই বাংলাদেশের কৃষকদের উন্নয়নে দরকার যুগান্তকারী পদক্ষেপ ও কৃষক বান্ধব সরকার, তবেই সুদৃঢ় হবে দেশের অর্থনৈতিক বুনিয়াদ।

SSC বাংলা ২য় পত্র পরিচ্ছেদ ৪৯ : প্রবন্ধ রচনা CQ — Prosthuti প্রশ্নব্যাংক

SSC · বাংলা ২য় পত্র · পরিচ্ছেদ ৪৯ : প্রবন্ধ রচনা · সৃজনশীল

বাংলাদেশের কৃষক

উদ্দীপক

যেকোনো একটি বিষয়ে প্রবন্ধ রচনা করো:

Comilla · 2020

উত্তর

ভূমিকা: মানুষের আচার-আচরণ ও আদর্শের শ্রেয় ও উৎকর্ষবাচক গুণকেই চরিত্র বলা হয়। এটি মানব-ব্যক্তিত্বের এমন একটি শক্তি যা সততা, ন্যায়-নিষ্ঠা, নীতিপরায়ণতা ও নৈতিক মূল্যবোধের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত। সচ্চরিত্রবান সত্যকথা ও সত্যচিন্তায় বিশ্বাসী, সকল অন্যায়-নিষ্ঠুরতার ঊর্ধ্বে তার অবস্থান। অন্যদিকে, দুশ্চরিত্রবানের অস্ত্রই হলো মিথ্যাচার, মন্দ কাজ, নিষ্ঠুরতা ইত্যাদি। মানবীয় গুণাবলির মধ্যে চরিত্র অন্যতম। এর মধ্যেই নিহিত থাকে মানুষের প্রকৃত পরিচয়। চরিত্র কী?: ব্যক্তি বিশেষের গুণাবলিই চরিত্র। এটি ইংরেজি 'Character শব্দের প্রতিশব্দ। বাংলায় 'চর' (চলা) ধাতু থেকে শব্দটি গঠিত হয়েছে। অর্থাৎ চরিত্র শব্দের সাথে গতির সম্পর্ক নির্দেশিত হয়েছে। মানুষের জীবনধারার গতির সাথেই চরিত্র-বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে। 'চরিত্র' শব্দটি। ইতিবাচক অর্থেই ব্যবহৃত হয়। প্রাত্যহিক জীবনে মানুষের চিন্তায়, কর্মে, আচার-আচরণে নৈতিকতা তথা উৎকর্ষবাচক গুণের প্রকাশকেই চরিত্র বলে অভিহিত করা হয়। অন্যদিকে, জীবনাচারে যদি আত্মমগ্নতা, স্বার্থপরতা, নীতিহীনতা প্রকাশ পায় তবে তাকে চরিত্রহীন বলা হয়। চরিত্র মানবজীবনের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। চরিত্রের বৈশিষ্ট্য: চরিত্রের বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করা হয় ব্যক্তিত্বের ইতিবাচক গুণ দিয়ে। নিম্নে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করা হলো: ১. সত্য কথা বলা; ২. সত্য চিন্তা করা; ৩. সহৃদয়তা, সংবেদনশীলতা, ন্যায়পরায়ণতা, ক্ষমাশীলতা, কর্তব্যপরায়ণতা, মানবিকতা ইত্যাদি; ৪. হিংসা-বিদ্বেষ ও পরশ্রীকাতরতা বর্জন; ৫. অন্তরশক্তির দৃঢ়তা; ৬. অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে আপসহীনতা; ৭. গুরুজনে ভক্তি; ৮. আত্মসংযম, নিরহংকার, মানবপ্রেম; ৯. সামাজিক রীতি-নীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা; ১০. অধ্যবসায়, বিনয়, ধৈর্য, সৌজন্য, ভ্রাতৃত্ব; ১১. দেশপ্রেম, অসাম্প্রদায়িকতা, জাতীয়তাবোধ। এসব বৈশিষ্ট্যের আলোকে ব্যক্তিত্বের বিকাশ সাধন হয় বলে চরিত্রবান ব্যক্তি দেশ ও জাতির সম্পদ। এজন্যই মহানবি হযরত মুহম্মদ (স.) বলেছেন, "তোমাদের মধ্যে সচ্চরিত্রবান ব্যক্তিই আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়।" চরিত্র গঠনের গুরুত্ব: গঠনগত দিক থেকে চরিত্রের দুটি দিক- ১. সচ্চরিত্র ও ২. দুশ্চরিত্র। ইতিবাচক গুণের সমন্বয়ে গঠিত হয় সচ্চরিত্র আর নেতিবাচক গুণ তথা পশুত্ব নিয়ে গঠিত হয় দুশ্চরিত্র। মানবজীবনে চরিত্র গঠনের গুরুত্ব স্বল্প কথায় অপ্রকাশ্য। বিদ্যার চেয়ে চরিত্রের মূল্য অধিকতর। কেননা, দুশ্চরিত্রবান বিদ্বান সমাজের বা দেশের কল্যাণের পরিবর্তে অকল্যাণই করে বেশি। অন্যদিকে, শুধু চরিত্রবলেই মানুষ হতে পারে বিশ্ববরেণ্য। অহিংস মনোভাব নিয়েই দেশ ও জাতির কল্যাণ সম্ভব হয়। আর তা একমাত্র, সচ্চরিত্রবানের পক্ষেই সম্ভব। তাই চরিত্র গঠনের গুরুত্ব অপরিসীম। এক্ষেত্রে একটা প্রচলিত সুভাষণ স্মরণযোগ্য: "অমরত্বের সুধা পান না করেও মানুষ অমর হতে পারে কেবল চরিত্রের গুণে।" চরিত্র গঠনে পরিবারের ভূমিকা: শিশুর চরিত্র গঠনে পরিবারই উপযুক্ত স্থান। শিশুরা অনুকরণপ্রিয়; শিশুর সুসংহত ব্যক্তিত্ব বিকাশের জন্য পরিবারের সবাইকে সচ্চরিত্রের গুণগুলো চর্চা করতে হবে। বার্ট্রান্ড রাসেল শিশুর চরিত্র গঠনে কতগুলো বিষয়ের উল্লেখ করেছেন: question image খুব কাছ থেকে শিশুকে নৈতিক চরিত্রের শিক্ষাদান পরিবারের পক্ষেই সম্ভব। সৎ সঙ্গ শিশুর প্রতিভা বিকাশে সহায়ক। সকল নিষ্ঠুরতা থেকে শিশুকে দূরে সরিয়ে রাখতে হবে। সৃষ্টিশীল কাজে শিশুকে উৎসাহিত করতে হবে। এভাবেই, চরিত্র বিকাশে পরিবার পালন করে প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তবে শিশুর চরিত্র গঠনে শিক্ষক-শিক্ষিকাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। চরিত্র গঠনে সমাজের ভূমিকা: চরিত্র গঠনে সমাজের ভূমিকাও অনস্বীকার্য। বিশেষত শৈশবে চরিত্র বিকাশে সমাজ-পরিমণ্ডল পালন করে অন্যতম সহায়ক ভূমিকা। পাড়া-প্রতিবেশী, সমবয়সি সঙ্গী-সাথী সবার সাথে মানবজীবন অতিবাহিত হয়। তাই এদের সবার প্রভাবেই গড়ে ওঠে ব্যক্তি চরিত্র। ফলে সামাজিক জীবনাচার যেন সৎ ও সুন্দর গুণাবলির সমন্বয়ে গঠিত হয় তার দিকে দৃষ্টি রাখতে হবে সবাইকে। শিক্ষার মাধ্যমে চরিত্র গঠন: শিক্ষা শুধু জ্ঞানার্জনেই সহায়তা করে না, উন্নত চরিত্র গঠনেও সাহায্য করে। উন্নত চরিত্র গঠনের জন্য প্রাণশক্তি, সাহস, সংবেদনশীলতা ও বুদ্ধির সমন্বয় প্রয়োজন। শিক্ষার মাধ্যমে ব্যক্তির মধ্যে এ বৈশিষ্ট্যগুলোর সঞ্চার করা হয়। পাঠ-প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীর মনে সাবলীলভাবে বেঁচে থাকার প্রেরণা জোগানো হয় এবং জীবনীশক্তির সঞ্চার করা হয়। জীবনের প্রতি জাগ্রত আগ্রহ ব্যক্তির সুস্থ মানসিকতা গঠনে সহায়তা করে। আবার শিক্ষার মাধ্যমে ব্যক্তি আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। ফলে নিজের বিচার বিবেচনা দ্বারা আচরণবিধি তৈরি করে। ব্যক্তি অর্জন করে উদার দৃষ্টিভঙ্গি। চিন্তার ক্ষেত্রে এ দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্তিকে ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। এভাবেই শিক্ষা ব্যক্তির উন্নত চরিত্র গঠনে সহায়তা করে। চরিত্রহীনতার কুফল: মানবজীবনের সর্বোৎকৃষ্ট সম্পদ চরিত্র। চরিত্রহীন ব্যক্তির মনে আশ্রয় নেয় অশুভ চিন্তা। আত্মচিন্তায় বিভোর ব্যক্তি লোভ-লালসায় মত্ত হয়ে পড়ে। যেকোনো পাপ কাজ করতে তার অন্তর কাঁপে না। তারা সমাজ ও দেশের কলঙ্ক। সবার ঘৃণাই তাদের পাথেয়। যতই বিত্তশালী হোক না কেন চরিত্রহীন মানুষ কখনোই কারও শ্রদ্ধা-ভালোবাসা পায় না। তাদের জীবন পশুর জীবনের চেয়েও নিকৃষ্ট। মহৎ চরিত্রের দৃষ্টান্ত: চরিত্রশক্তিতে বলীয়ান ব্যক্তিগণ অমরত্ব নিয়ে মানব মনে বেঁচে থাকে চিরকাল। অন্যায়, অসত্য ও পাপের বিরুদ্ধে এসব মহৎ ব্যক্তির দৃঢ় অবস্থান অক্ষয় ঔজ্জ্বল্য নিয়ে আলোকিত করে সবাইকে। তারা ধনসম্পদে সমৃদ্ধ না হলেও গৌরবৌশ্বর্যে মহীয়ান। এমনই চরিত্রের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হযরত মুহম্মদ (স.), যীশুখ্রিষ্ট, গৌতমবুদ্ধ, বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায়, মহাত্মা গান্ধী, মওলানা ভাসানী, হাজী মুহম্মদ মুহসীন প্রমুখ। এরা সবাই মানবব্রতী, দেশব্রতী, উন্নত ও মহৎ চরিত্রের অধিকারী। উপসংহার: দিকে দিকে আজ অমঙ্গলের প্রভাব পরিলক্ষিত। মানুষের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা যেন বিলুপ্ত। বিশ্বব্যাপী আজ বেড়েছে ভোগ করার প্রবণতা এবং কমেছে মূল্যবোধ। এমতাবস্থায় চরিত্রের নবজাগরণ একান্ত প্রয়োজন। কেননা, চরিত্রবান নাগরিকই অনৈতিকতার অন্ধকার থেকে জাতীয় জীবনকে রক্ষা করতে পারবে। চরিত্রের মহিমায় মানুষকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে মূল্যবোধ। কবির কণ্ঠে মহৎ চরিত্র গঠনের বাণী শোনা যায়- 'এমন জীবন হবে 'করিতে গঠন হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভুবন।' মরণে হাসিবে

উত্তর

সূচনা: মা, মাতৃভূমি আর মাতৃভাষা মানব অস্তিত্বের প্রধান তিনটি অবলম্বন। মানুষের পরিচয়ের সেরা কষ্টিপাথর মাতৃভাষা, দেশের ভাষা ও জাতির ভাষা। মাতৃভাষার অধিকার মানুষের জন্মগত অধিকারসমূহের মধ্যে অন্যতম। এ অধিকার নিজের মতো করে কথা বলার অধিকার, স্বতঃস্ফূর্ত চেতনায় উদ্ভাসিত স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার। বাঙালির মাতৃভাষা বাংলা। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য জীবন দিয়েছিলেন বরকত, সালাম, রফিক, শফিউর, জব্বারসহ আরও অনেকে। তাঁদের রক্তে রঞ্জিত একুশে ফেব্রুয়ারি এখন বিশ্বজনীন 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে স্বীকৃত। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের পটভূমি: আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের রয়েছে একটি গৌরবদীপ্ত ঐতিহাসিক পটভূমি। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে পূর্ববাংলার জনগণ বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছিল। বাঙালির সেই ঐতিহাসিক 'শহিদ দিবস' ২১শে ফেব্রুয়ারি আজ সারাবিশ্বের 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস'। ১৪ আগস্ট, ১৯৪৭-এর পাকিস্তান সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই বাঙালি জাতির চেতনায় বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের তরঙ্গ প্রবাহিত হয়েছিল। তদানীন্তন পাকিস্তান রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন ঘটে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে। নবগঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা ছিল বাংলা, কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে বাংলা ভাষাকে পাশ কাটিয়ে গোপনে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে ওঠে। যদিও উর্দু ছিল মাত্র ৪ শতাংশ লোকের মাতৃভাষা। সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষাকে উপেক্ষা করে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পাকিস্তানি শাসকদের এ অপচেষ্টা বাঙালিকে বিদ্রোহী করে তোলে। ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে একটি প্রস্তাব পাস করা হলে পূর্ব পাকিস্তানের জাগ্রত ছাত্রসমাজ এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল প্রচন্ড ক্ষোভের সাথে। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যতই বাংলা ভাষার বিরোধিতা করতে থাকে, ততই বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন জোরালো হতে থাকে। সমগ্র 'পূর্ববাংলা একই অঙ্গীকারে ঐক্যবদ্ধ হয়। বাঙালি ঘোষণা করেছিল, উর্দুর সঙ্গে সঙ্গে বাংলাকে দিতে হবে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা। কিন্তু পাকিস্তান সরকার এ দাবি না মেনে ঘোষণা করে, 'উর্দু, একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা'। এ অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্তের ফলে সরকার ও পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রসমাজের মধ্যে তুমুল লড়াই বাধে। এরই জের হিসেবে বায়ান্নর ২১শে ফেব্রুয়ারিতে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার আন্দোলনরত নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার মিছিলে নির্বিচারে গুলি চালায়। অনেক প্রাণের তাজা রক্তে সেদিন রঞ্জিত হয় রাজপথ। এ নৃশংসতা আন্দোলনকে আরও বেগবান করে তোলে; গর্জে ওঠে সারা বাংলা। আতঙ্কিত সরকার বাধ্য হয়ে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এরপর থেকে রক্তাক্ত একুশে ফেব্রুয়ারি শহিদ দিবস হিসেবে পালিত হয়। সময়ের দাবিতে ভাষা আন্দোলন পরিণত হয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে। একুশের চেতনাই বাঙালিকে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার শক্তি জুগিয়েছে। মাতৃভাষার জন্য বাঙালির সেদিনের আত্মত্যাগ বিফলে যায়নি। একুশ এখন আর কেবল বাঙালির 'শহিদ দিবস' নয়; একুশ এখন সারাবিশ্বের। বিশ্বের ১৮৮টি দেশে শহিদদের অভূতপূর্ব আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করা হয় এ দিনে। বাঙালির 'শহিদ দিবস' এখন বিশ্ববাসীর 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস'। এককথায়, একুশে ফেব্রুয়ারির চেতনাজাত প্রয়াসের ফসল 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।' আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি: '৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের গণমানুষের দৃঢ় অঙ্গীকারই বিশ্বসভায় বাংলা ভাষাকে মর্যাদার আসন দিয়েছে। সত্যিকার অর্থে মা, মাতৃভূমি ও মাতৃভাষার প্রতি আমাদের হৃদয়ছোঁয়া আবেগই বাংলা ভাষার বিশ্বায়নে সহায়তা করেছে। ২১শে ফেব্রুয়ারির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের জন্য প্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করে কানাডায় বসবাসরত প্রবাসীদের সংগঠন 'Mother Language Lovers of the WorldWorld^{\prime}। এর নেপথ্যে যে দুজন বাঙালির অবদান সবচেয়ে বেশি তাঁরা হলেন- আবদুস সালাম ও রফিকুল ইসলাম। তাঁরাই ১৯৯৮ সালের ৯ই জানুয়ারি ২১শে ফেব্রুয়ারিকে 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' ঘোষণার জন্য জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব কাফ কাছে একটি আবেদনপত্র পাঠান। সাতটি ভাষার ১০ জন মানুষ এ আবেদনপত্রে স্বাক্ষর করেন। কফি আনান ইউনেস্কোর সাথে যোগাযোগ করার পরামর্শ জানালে ইউনেস্কোকে একটি আবেদনপত্র পাঠানো হয়। কিন্তু ইউনেস্কোর তৎকালীন শিক্ষা বিভাগের প্রোগ্রাম বিশেষজ্ঞ মিসেস আনা মারিয়া আবেদনের উত্তরে বেসরকারি সংগঠনের উদ্যোগে কোনো প্রস্তাব গ্রহণের অপারগতা জানান। তিনি বলেন, সরকারের মাধ্যমে আবেদন করা হলে ইউনেস্কো তা বিবেচনা করে দেখবে। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ সরকারের মাধ্যমে বিষয়টি জাতিসংঘে উত্থাপিত হয়। ১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর ইউনেস্কোর ৩০তম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে বাংলাদেশসহ ২৮টি দেশের সমর্থন নিয়ে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এ স্বীকৃতি হচ্ছে মাতৃভাষার জন্য বাংলাদেশের অনন্য ত্যাগের স্বীকৃতি প্রদান। এরই আলোকে ২০০০ সালের ২১শে, ফেব্রুয়ারি বিশ্বব্যাপী পালিত হয় 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস'। বাঙালির 'শহিদ দিবস' এখন পালিত হয় ইউনেস্কোর ১৮৮টি সদস্য দেশে এবং ফ্রান্সে ইউনেস্কোর সদর দপ্তরে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের তাৎপর্য: যেকোনো দেশের শিল্প- সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে সে দেশের মাতৃভাষাতেই। তাই ভাষাই একটি দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক। ইউনেস্কোর সম্মেলনে 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' পালনের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করে বলা হয়, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে ভাষা হচ্ছে সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। মাতৃভাষা দিবস কেবল কোনো দেশ বা জাতির গোষ্ঠী চেতনাকেই সম্মানিত করে না, বরং বিশ্বের প্রতিটি জাতির ভাষার প্রতিই মর্যাদা প্রদর্শন করে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের তাৎপর্য হলো সব মাতৃভাষাকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া, যথাযোগ্য মর্যাদা দেওয়া, বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা, দুর্বল বলে কোনো ভাষার প্রতি প্রভুত্ব আরোপের অপচেষ্টা না করা, ছোটো-বড়ো সব জাতির ভাষাকে সমমর্যাদা দান করা। একুশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমে কেবল বাঙালির মাতৃভাষার প্রতিই নয়, বিশ্বমানবের আপন ভাষার মর্যাদার দিকটিও এতে শনাক্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে এ দিবস পালনের ফলে বিশ্ব সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ ও বাঙালির মাংশালো ও বাড্যালর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য মূল্যবোধ সম্পর্কে কৌতূহল সৃষ্টি হচ্ছে। একুশের অনন্য চেতনা বিশ্ববাসীকে নিজ নিজ ভাষাকে ভালোবাসার প্রেরণা জোগাচ্ছে। 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' পালনের মাধ্যমে আন্তঃরাষ্ট্রীয় নৈকট্য বাড়ছে। বিশ্ববাসীর পদচারণায় আমাদের ভাষা হচ্ছে শক্তিশালী এবং ক্রমবিকাশমান। ভাষার প্রতি বাঙালির আত্মত্যাগ আর ভালোবাসা বিশ্ববাসীকে শিখিয়ে দিল আপন ভাষা ও আপন সংস্কৃতিকে ভালোবাসার মন্ত্র। 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস'র তাৎপর্য উপলব্ধি করে ভাষাবিজ্ঞানী ড. হুমায়ুন আজাদ বলেন, 'আমি মুগ্ধ, আমি প্রীত, আমাকে স্বীকৃতি দিয়েছে, আমার প্রাণের কথা আমার ভাষায় জানাতে পারব বলে আমার হৃদয়-স্পন্দন বেড়েছে। সত্যিই গর্বিত আমি।' উপসংহার: 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে স্বীকৃতি লাভের পর বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বিশ্বদরবারে লাভ করেছে ব্যাপকতা, পেয়েছে বিশেষ মহত্ত্ব। আন্তর্জাতিকীকরণের মাধ্যমে একুশে ফেব্রুয়ারি পেয়েছে নতুন মহিমা, নতুন গরিমা, নতুন মর্যাদা। ভাষার এ বৈশ্বিক স্বীকৃতি আমাদের দুর্লভ অর্জন। ভাষার প্রশ্নে তাই আমরা আনন্দিত ও গর্বিত। তবে আমরা মাতৃভাষাকে ভালোবাসা এবং সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি বিশ্বের সব মানুষের মাতৃভাষার প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করব- এ চেতনায় অঙ্গীকারবদ্ধ হলেই এ মহান দিবসের সার্থকতা পরিস্ফুট হবে।

উত্তর

ভূমিকা: শস্য শ্যামল বাংলার অর্থনীতির প্রধান উৎস কৃষি। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। এদেশের অধিকাংশ মানুষের জীবিকা কৃষির সাথে সম্পৃক্ত। কৃষকদের সীমাহীন শ্রম আর আত্মত্যাগের বিনিময়ে গড়ে উঠেছে এদেশের অর্থনৈতিক বুনিয়াদ। বাংলাদেশের কৃষি আর কৃষকদের কথা বাদ দিলে এদেশের অর্থনীতিকে অস্বীকার করা হয়। শুধু দেশীয় অর্থনীতিতেই কৃষকদের ভূমিকা সমাপ্ত নয়, জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতিতেও আছে কৃষকদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান। বাংলাদেশের কৃষক: কৃষি ব্যবস্থাপনাটি পৃথিবীর প্রাচীন পেশা হিসেবে স্বীকৃত। সভ্যতার উষালগ্নে কৃষিই ব্যাপক অবদান রেখেছিল। ফলে পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেই কমবেশি কৃষির বিস্তার ঘটেছিল। আর এ সূত্র ধরেই কৃষকদেরও বিস্তার হতে থাকে। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো শিল্প উৎপাদন থেকে তাদের জাতীয় আয় ও অর্থনীতিকে কল্পনা করে থাকে- কিন্তু তাই বলে কৃষিকে তারা বাদ দিয়ে ফেলেনি। উদাহরণ হিসেবে চীনের কথা বলা যেতে পারে। তাদের ইলেকট্রনিক সামগ্রীতে ছেয়ে আছে গোটা বিশ্ব। বলা চলে, এটিই তাদের অর্থনীতির প্রধান খাত। কিন্তু তাদের দেশের কৃষকদের অবস্থা অনেক উন্নত, গুরুত্বও অনেক বেশি। তাদের দেশের কৃষকদের কৃষিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাহচর্য তাদের অনেক বেশি আধুনিক করে রেখেছে। সেদিক থেকে বাংলাদেশের কৃষকদের অবস্থা খুব একটা সন্তোষজনক নয়। বাংলাদেশের কৃষক বলতে বোঝায় নিরক্ষর, রোগক্লিষ্ট ও ঋণভারে জর্জরিত অসহায় এক সম্প্রদায়কে। তারা পৃথিবীর জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রভূত উন্নতি সম্পর্কে বলা চলে অজ্ঞ। জীর্ণ-কুটিরে বাস করে হিসাব কষে বীজ রোপণের, ফসল কাটার। হালের গরু আর সেকেলে লাঙল-জোয়াল তাদের বেঁধেছে সহজ-সরল জীবনে। তাদের জীবনে উচ্চাশা বলতে কিছু নেই, বরং ক্ষুদ্র চাওয়াটুকু থেকেও তারা বঞ্চিত। উন্নত দেশসমূহের কৃষকরা প্রশংসিত আর বাংলাদেশের কৃষকরা অবহেলিত। বর্তমানে কিছুসংখ্যক আধুনিক যন্ত্রের দেখা মিললেও তা সন্তোষজনক নয়। কৃষকের গুরুত্ব: দেশের জাতীয় আয় ও অর্থনীতিতে কৃষি যে ভূমিকাপালন করে এর সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত এদেশের কৃষক। প্রয়োজনীয় খাদ্যের জোগান দিয়ে কৃষকরা আমাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। শস্য উৎপাদনে বাংলাদেশের কৃষকরা যদি সক্রিয় ভূমিকা পালন না করত তাহলে নিত্য দুর্ভিক্ষের মধ্য দিয়ে বিপন্ন হতো দেশের মানব অস্তিত্ব। বাংলাদেশের ৮০ শতাংশ খাদ্যশস্যের জোগান দেয় এদেশের কৃষক। একসময় সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হতো কৃষকের উৎপাদিত পাট থেকে। আজও পাটজাত দ্রব্যের সর্বাংশের জোগান আসে কৃষকদের হাত থেকেই। পুষ্টিহীনতা আমাদের দেশের একটি জাতীয় সমস্যা। বিশেষত গ্রামাঞ্চলের মানুষরা অপুষ্টিতে ভুগে। এ সমস্যা দূরীকরণে কৃষকরা প্রাণপণ চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। তাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য, শাকসবজি ও ফলমূল থেকে ভিটামিনের চাহিদা পূরণ করা হয়ে থাকে, যা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কৃষকরা যদি তাদের উৎপাদন বন্ধ করে দিত শুধু জনস্বাস্থ্যই হুমকির মুখে পড়ত না গভীর খাদ্য সংকটের মুখোমুখি হতে হতো মানুষের। মূলত কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে কৃষিই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ভরসা এবং আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূল কেন্দ্রবিন্দু। 'সব সাধকের বড় সাধক আমার দেশের চাষা,.. দেশ মাতারই মুক্তিকামী, দেশের সে যে আশা।' কৃষকের অতীত অবস্থা: বাংলাদেশের কৃষকদের অতীত অবস্থা ছিল অনেকটা রূপকথার মতো। গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ- এসব পরিচিত বচনগুলো রূপকথা মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে সেটিই ছিল একসময়ের কৃষকদের জীবনবাস্তবতা। অতীতে কৃষকদের আবাদি জমির পরিমাণ ছিল পর্যাপ্ত, মাটি ছিল উর্বর। মানুষ কম ছিল, চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি ছিল উৎপাদন। আজকের কৃষকরা মহাজনদের কাছে ঋণের দায়ে জর্জরিত, কিন্তু অতীতের কৃষকরা ঋণগ্রস্ত ছিল না, ছিল দুশ্চিন্তামুক্ত প্রফুল্ল জীবনের অধিকারী। কৃষকদের বর্তমান অবস্থা: বর্তমান বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষক ভূমিহীন। দেশে আবাদি জমির পরিমাণ দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে বিপরীতে কৃষিজমি ভরাট হচ্ছে যত্রতত্র। কৃষকরা অন্যের জমিতে বর্গা দিয়ে কোনো রকমে যাপন করছে তাদের জীবন। সার, কীটনাশকের মূল্য চড়া। কৃষকদের সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে অত্যাবশ্যক এ কৃষি উপাদান *। এমনকি টাকা দিয়ে যে সার কিনবে সে সার সরবরাহেও মাঝেমধ্যে বিঘ্ন ঘটে। সার চাইতে গিয়ে কৃষককে দিতে হয় চড়া মূল্য। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগে যেখানে কৃষক পাওয়ার কথা কলের লাঙল আর অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা সেখানে কৃষকরা পাচ্ছে না দুটি হালের বলদ। এ অবস্থা কাম্য হতে পারে না। প্রয়োজন কৃষকদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা, প্রয়োজন তাদের চাহিদাগুলোর পূরণ। কৃষকদের দুরবস্থার কারণ: আমাদের দেশের কৃষকরা কৃষিকাজ করে অভ্যাস বা পেশাগত পরম্পরা মেনে; কিন্তু তাদের বিজ্ঞাননির্ভর হওয়া জরুরি। কৃষকরা এখনো প্রাচীন পদ্ধতিতে চাষ করে বলে শ্রম বেশি হচ্ছে বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে কম। ত্রুটিপূর্ণ ভূমি ব্যবস্থাও আজকের কৃষকদের দূরবস্থার একটি বড়ো কারণ। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও কৃষকদের একটি বড়ো অংশের নিজস্ব ভূমি নেই। অন্যের জমিতে চাষ করে জমির মালিককে বর্গা দিয়ে কৃষক যা পায় তাতে তার স্বাভাবিক জীবন-যাপন করাই কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে দরিদ্র কৃষক দরিদ্রই থেকে যাচ্ছে আর মালিক-মহাজনরা স্থির বসে আছে মহাজনি কাজে। বন্যা, খরা, ঝড়, জলোচ্ছ্বাসসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়মিতই আঘাত করে এদেশের কৃষকদের। নিঃস্ব কৃষক নব উদ্যোমে আবারও ঘুরে দাঁড়ায় আর আমরা কাটাই নির্ঝঞ্ঝাট জীবন। কৃষকদের উন্নতির উপায়: বাংলাদেশের কৃষকদের দুরবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে আরও সক্রিয় হতে হবে। স্থানে স্থানে কৃষকদের অত্যাধুনিক চাষবিষয়ক কর্মশালার আয়োজন করে কৃষকদের বিজ্ঞাননির্ভর করে তুলতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কৃষকদের রাষ্ট্র কর্তৃক মূলধন দিয়ে সহযোগিতা করা যেতে পারে। আধুনিক সেচব্যবস্থার প্রচলনকে সম্প্রসারণ করতে হবে এবং কৃষকদের কাছে তা পৌঁছতে হবে সাশ্রয়ী মূল্যে। সার, কীটনাশকসহ যাবতীয় কৃষিজ উপকরণ কৃষকদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে পারলে এটি হবে একটি বড়ো কাজ। বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকার এ ব্যাপারে বেশকিছু সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। মহাজনদের চড়া সুদের ঋণ থেকে কৃষককে রক্ষা করার জন্য কৃষি ব্যাংককে সচল রেখেছে। সময়ে সময়ে সারের জোগান দিয়ে সার আমদানি বা ক্রয় করে কৃষকদের প্রতি সরকারের সহায়তা অব্যাহত রেখেছে। কিন্তু সরকারকে এ ব্যাপারে আরও বেশি উদার হতে হবে, হতে হবে কৃষকদের প্রতি আন্তরিক। উপসংহার: বাংলাদেশের কৃষক বাঁচলে অর্থনীতি বাঁচবে। কৃষক বেশি উৎপাদন করতে পারলে জাতীয় উন্নয়ন 'ত্বরান্বিত হবে। তাই বাংলাদেশের কৃষকদের উন্নয়নে দরকার যুগান্তকারী পদক্ষেপ ও কৃষক বান্ধব সরকার, তবেই সুদৃঢ় হবে দেশের অর্থনৈতিক বুনিয়াদ।
SSCবাংলা ২য় পত্রপরিচ্ছেদ ৪৯ : প্রবন্ধ রচনা
12টি সম্পর্কিত প্রশ্ন — ব্যাখ্যা লকড

1.সৃজনশীল প্রশ্ন

উদ্দীপক

যেকোনো একটি বিষয়ে প্রবন্ধ রচনা করো:

Barisal · 2019

জাতি গঠনে নারীসমাজের ভূমিকা
মানবকল্যাণে বিজ্ঞান

উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখতে ফ্রি রেজিস্ট্রেশন করো

ফ্রি শুরু করো

2.বৃক্ষরোপণ অভিযান

বৃক্ষরোপণ অভিযান

উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখতে ফ্রি রেজিস্ট্রেশন করো

ফ্রি শুরু করো

3.জাতি গঠনে নারীসমাজের ভূমিকা

জাতি গঠনে নারীসমাজের ভূমিকা

উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখতে ফ্রি রেজিস্ট্রেশন করো

ফ্রি শুরু করো

4.সৃজনশীল প্রশ্ন

উদ্দীপক

যেকোনো একটি বিষয়ে প্রবন্ধ রচনা করো:

Jessore · 2019

স্বদেশপ্রেম
মানবকল্যাণে বিজ্ঞান
পরিবেশ দূষণ ও তার প্রতিকার

উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখতে ফ্রি রেজিস্ট্রেশন করো

ফ্রি শুরু করো

5.মানবকল্যাণে বিজ্ঞান

মানবকল্যাণে বিজ্ঞান

উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখতে ফ্রি রেজিস্ট্রেশন করো

ফ্রি শুরু করো

6.স্বদেশপ্রেম

স্বদেশপ্রেম

উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখতে ফ্রি রেজিস্ট্রেশন করো

ফ্রি শুরু করো

7.সৃজনশীল প্রশ্ন

উদ্দীপক

যেকোনো একটি বিষয়ে প্রবন্ধ রচনা করো:

Sylhet · 2019

দেশ গঠনে ছাত্রসমাজের ভূমিকা
বাংলাদেশের বেকার সমস্যা ও তার প্রতিকার

উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখতে ফ্রি রেজিস্ট্রেশন করো

ফ্রি শুরু করো

8.পরিবেশ সংরক্ষণে বনায়ন

পরিবেশ সংরক্ষণে বনায়ন

উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখতে ফ্রি রেজিস্ট্রেশন করো

ফ্রি শুরু করো

9.দেশ গঠনে ছাত্রসমাজের ভূমিকা

দেশ গঠনে ছাত্রসমাজের ভূমিকা

উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখতে ফ্রি রেজিস্ট্রেশন করো

ফ্রি শুরু করো

10.সৃজনশীল প্রশ্ন

উদ্দীপক

যেকোনো একটি বিষয়ে প্রবন্ধ রচনা করো:

Chittagong · 2019

স্বদেশপ্রেম
পরিবেশ দূষণ ও তার প্রতিকার

উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখতে ফ্রি রেজিস্ট্রেশন করো

ফ্রি শুরু করো

11.বাংলাদেশের ঋতুবৈচিত্র্য

বাংলাদেশের ঋতুবৈচিত্র্য

উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখতে ফ্রি রেজিস্ট্রেশন করো

ফ্রি শুরু করো

12.স্বদেশপ্রেম

স্বদেশপ্রেম

উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখতে ফ্রি রেজিস্ট্রেশন করো

ফ্রি শুরু করো

আরো প্রশ্ন দেখো

আরো হাজারো প্রশ্ন + মডেল টেস্ট

ফ্রি রেজিস্ট্রেশন করো — ফেভারিট, AI টিউটর, লিডারবোর্ড ও অ্যানালিটিক্স আনলক করো।