'আধুনিক যুগে বিভিন্ন মহাপুরুষের উপাসনা হিন্দুধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সামাজিক ও ধর্মীয় মতভেদ সৃষ্টি করেছে' উক্তিটি যথার্থ।আধুনিক যুগে হিন্দু সম্প্রদায় বিভিন্ন দেব-দেবীর উপাসনার মাধ্যমে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এ যুগের মহাপুরুষ ও ধর্মসংস্কারকগণ বিভিন্নভাবে ধর্মীয় তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। রাজা রামমোহন রায় বলেন, সব উপাস্য একই ব্রহ্মের বিভিন্ন প্রকাশ। তিনি হিন্দুধর্মাবলম্বীদের এক ব্রহ্মের সাধনার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ব্রহ্মই একমাত্র আরাধ্য এবং হিন্দুরা একেশ্বরবাদী। আবার শ্রীরামকৃষ্ণ একেশ্বরবাদী ধারণা এবং বহু দেব-দেবীরূপে ঈশ্বর আরাধনার কথা বলেছেন। তার উপদেশ হলো- 'যত মত, তত পথ'; 'যত্র জীব, তত্র শিব'।হরিচাঁদ ঠাকুর হিন্দু সমাজে সকল ধর্ম ও বর্ণের মানুষকে এক হরিনামে মেতে থাকার আহ্বান জানান। তার মতে, হরিনামই জগতে কল্যাণ, শান্তি, সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ। চৈতন্য মহাপ্রভুর হিন্দুধর্ম চেতনায় বিভিন্ন দেব-দেবীর অনুসারীদের বিদ্বেষ এবং বর্ণভেদ দূর করতে প্রেমভক্তি মতবাদের প্রচলন করেন। তিনি বলেন, প্রেমপূর্ণ ভক্তি দিয়েই ভগবানকে লাভ করা যায়। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমবেত উপাসনায় চরিত্র গঠন, সমাজসংস্কার, ব্রহ্মচর্য, স্বাবলম্বন ও জগতের কল্যাণের জন্য স্বামী স্বরূপানন্দ 'অযাচক আশ্রম' প্রতিষ্ঠা করেন। স্বামী প্রণবানন্দ সেবাদর্শের কথা প্রচার করেছেন। লোকনাথ ব্রহ্মচারী লোকসেবা বা লোকশিক্ষার কথা প্রচার করেছেন। সততা, নিষ্ঠা, সংযম, সাম্য ও সেবা ছিল তার নৈতিক আদর্শের মূলমন্ত্র। উপরে আলোচনায় হিন্দুধর্মের চিন্তা-চেতনায় বিভিন্ন মত ও পথের সন্ধান পাওয়া যায়। তবে এই ভিন্ন মত ও পথগুলোর মধ্যে এক মহামিলন লক্ষ করা যায়। আর তা হলো, মানব জীবনের ব্যবহারিক সমৃদ্ধিসহ আধ্যাত্মিক জীবনের পরম কল্যাণ তথা ঈশ্বরলাভ।