একটি ঝড়ের রাত
উত্তর: একটি ঝড়ের রাত ভূমিকা : বাংলাদেশের ষড়ঋতুর মধ্যে গ্রীষ্ম সবচেয়ে খরতাপের ঋতু, ভয়ংকর ঋতু। গ্রীষ্ম দিয়ে আমাদের ঋতুচক্রের যাত্রা শুরু হয়। শেষ ঋতু রোমান্টিক বসন্তের পর ঘামঝরা গ্রীষ্মের আগমন ঘটে। এ সময়ে নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর-ডোবায় তেমন একটা পানি থাকে না। মাঠ ঘাট প্রান্তর শুকিয়ে মাটি ফেটে হা-করে থাকে। চারদিকে শুধু ধূলি আর ধূলি। রসহীন রোদের সুতীব্র উত্তাপে মাথার মগজ গলে যেতে চায়। শূন্য পায়ে মেঠো পথে হাঁটা যায় না। গ্রীষ্মের প্রথম মাস বৈশাখ, কালবৈশাখির মাস। ঝড়-তুফানের তাণ্ডবলীলা শুরু হয় এ মাস থেকে। ঝড়ের পূর্বাভাস: বৈশাখ মাস। ভোর' থেকেই কেমন যেন এক ধরনের গুমোট ভাব ছিল আকাশে। দুপুর বেলার গরমটা একেবারে অসহ্য লাগল। প্রবল বেগে বাতাস বইছে-তবু গরমের দাপটে ঘরে থাকা যায় না। ঘাম ঝরছে অবিরাম। বারবার ঘাম মুছতে হচ্ছে। দুপুর শেষ হয়ে এলো। দুপুরের পরপরই হঠাৎ বাতাস বন্ধ হয়ে গেল। প্রকৃতি নিথর নিস্তব্ধ হয়ে গেল। গাছের একটি পাতাও নড়ছে না। আকাশের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে একখন্ড মেঘ দেখা দিল। মেঘখণ্ড ক্রমে ক্রমে ঘনতর হতে হতে কালো হয়ে উঠল এবং দেখতে দেখতে পূর্ব-দক্ষিণ আকাশকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। নদীর অবস্থা: সন্ধ্যার দিকে নদীর অবস্থা ভয়ংকর রূপ ধারণ করল। উঁচু ঢেউগুলো প্রবল বেগে ছুটে এসে নদীর পাড়ে আঘাত খেয়ে ভেঙে পড়ছিল। অনেক দূর থেকে শোনা যাচ্ছিল ঢেউ ভাঙার শব্দ। রেডিও, টেলিভিশন থেকে সতর্কবাণী প্রচারের সাথে সাথে হুঁশিয়ার মাঝিরা আগেই নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। যেসব নৌকা তখন নদী পাড়ি দিয়ে আসছিল, তাদের আরোহীরা ভয়ে আর্তরব জুড়ে দিল। আবহাওয়ার পরিবর্তন: ক্রমে ক্রমে অন্ধকার হয়ে এলো। ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাতে শুরু করল। আবহাওয়ার পরিবর্তন ঘটল। হঠাৎ করে প্রবল বেগে শোঁ শোঁ শব্দে বাতাস বইতে শুরু করল। এতক্ষণ ধরে যে বিস্ফোরিত শব্দে বজ্রের গর্জন চলছিল-তাও থেমে গেল। কেমন একটা গুমগুম ভাব। সবার মনে আতঙ্কের সৃষ্টি হলো। পথচারীরা স্কুলঘরে, পথের পাশে যে বাড়িতে যে পারল আশ্রয় নিল। শুকনো পাতা ও খড়কুটা শূন্যে উড়তে লাগল। ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকানিতে এসব দৃশ্য কারও চোখ এড়িয়ে গেল না। সামনে যা কিছু পড়ল তাতেই বাতাস এসে আঘাত করল। মড়াৎ মড়াৎ শব্দে কোনো কোনো গাছের ডাল ভাঙল, কোনোটার ফলমূল ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে দূরে গিয়ে ছিটকে পড়ল, কোনোটা আবার ছিন্নমূল হয়ে মাটিতে শুয়ে পড়ল। লোকালয়ের অবস্থাঃ লোকালয়ের অবস্থাও ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। কোনো ঘরের চাল উড়ে গেল, বেড়া পড়ে গেল, কোনোটা আবার মটমট শব্দ করে ধূলিসাৎ হলো। গরু-বাছুর গোয়ালের এক কোণে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে কাঁপতে লাগল। কোনো কোনো গোয়ালের চাল উড়ে গেল। বিদ্যুতের চমকানিতে দেখা গেল গরু-বাছুরের করুণ দৃশ্য। মানুষেরা আজানের বাণী চিৎকার দিয়ে আওড়াতে লাগল। নানা দোয়া-কালাম পড়তে লাগলেন। কালবৈশাখির প্রচন্ড আঘাতে ঘর ভেঙে পড়বে ভেবে কেউবা নিজের দুর্বল ঘর ছেড়ে অন্য কোথাও আশ্রয় নিল। কেউবা আঘাত খেয়ে কাতর আর্তনাদ করতে লাগল। মুষলধারে শুরু হলো বৃষ্টি। শুরু হলো বজ্রের গর্জন। পরিস্থিতি এতই ভয়াবহ রূপ ধারণ করল যে, আর বুঝি রক্ষা পাওয়া যাবে না। গভীর রাতের অবস্থা: বৃষ্টি এবং ঝড়ের গতিবেগ আরও বাড়ল। গুড়ুম গুড়ুম বজ্রের গর্জন, মড়াৎ মড়াৎ শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যায় না। বৃষ্টি আর দমকা বাতায়ের দাপটে বেড়ার ফুটো দিয়ে পানি এসে আমাদের ঘরের মেঝে ডোবার মতো হয়ে গেল। হঠাৎ দরজায় ঠকঠক শব্দ শুনে খিল খোলামাত্র হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকলেন বড়ো চাচা, বড়ো চাচি ও তাদের ছেলেমেয়েরা। তাদের ঘরের চাল উড়ে কোথায় গেছে বলতে পারেন না। এমনিভাবে ভয়ংকর প্রলয়নৃত্য চলল মাঝরাত পর্যন্ত। ঝড়ের পরের দৃশ্য: ভোর হলো। বৃষ্টি থামল। গৃহস্থেরা দা-বঁটি হাতে নিয়ে ঘরের বাইরে বের হয়ে এলো। রাস্তায় বহু গাছ ভেঙে পড়ে আছে। ঘরের চাল, বেড়া পড়ে আছে। গাছের ডাল কেটে, ঘরের চাল, বেড়া সরিয়ে পথ পরিষ্কারের কাজ শুরু হলো। গৃহস্থেরা প্রথমেই গোয়ালের পথ পরিষ্কার করে নিল। কোনো কোনো গোয়াল ঘর কাত হয়ে আছে, কোনোটা দুমড়ে-মুচড়ে মাটিতে পড়ে গেছে। কারও কারও গোয়াল থেকে রশি ছিঁড়ে গরুগুলো কোথায় পালিয়ে গেছে। পথে-ঘাটে মাঠে-ময়দানে কত পাখি মরে ও আধমরা হয়ে পড়ে আছে তার কোনো হিসাব নেই। ডিমসহ পড়ে আছে অসংখ্য বাবুই পাখির বাসা। রাশি রাশি আম পড়ে গাছতলা ভরে আছে। ঘরদোর ও গরুবাছুরের দুর্দশার কারণে ওদিকে কারও মনোযোগ নেই। এমন ভয়ংকর কালবৈশাখির রাত আগে আমি আর কখনো দেখিনি। উপসংহার: প্রকৃতির রুদ্ররোষের কাছে আমরা অসহায়। বৈশাখ মাস এলে প্রতিবছরই কালবৈশাখি ঝড় হয়। কোনো কোনো অঞ্চলে ভয়াবহ এবং কোনো কোনো অঞ্চলে ছোটো ধরনের ঝড় হয়। কিন্তু ঝড় থেকে রেহাই পায় না বাংলাদেশের মানুষ। প্রকৃতির এই তাণ্ডবলীলা মোকাবেলা করেই আমাদের বেঁচে থাকতে হয়।
SSC বাংলা ২য় পত্র পরিচ্ছেদ ৪৯ : প্রবন্ধ রচনা CQ — Prosthuti প্রশ্নব্যাংক
SSC · বাংলা ২য় পত্র · পরিচ্ছেদ ৪৯ : প্রবন্ধ রচনা · সৃজনশীল
একটি ঝড়ের রাত
উত্তর