লঞ্চ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা।
উত্তর: লঞ্চ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ভূমিকা: যেকোনো ভ্রমণ মানুষের মনকে পুনরুজ্জীবিত করে। ভ্রমণ আনন্দের উৎস হিসেবে ধরা দেয় মানবজীবনে। আমার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। আমি আমার ছোট্ট জীবনে বাস ও ট্রেন ভ্রমণ করলেও লঞ্চ বা জাহাজ ভ্রমণ করিনি কখনো। এমনকি একবার আমি উড়োজাহাজ বা প্লেন ভ্রমণও করেছি। আর আমি ভীষণ ভ্রমণপিপাসু। এজন্য আমি লঞ্চ বা জাহাজ ভ্রমণের অপেক্ষায় ছিলাম। অবশেষে অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আমার লঞ্চ ভ্রমণের সুযোগ এসে গেল; তাও আবার আমার প্রিয় কবি জীবনানন্দ দাশের জন্মভূমি বরিশালে। ভ্রমণের প্রস্তুতি: নদী ও খালের জন্য বিখ্যাত বরিশাল। সেই বরিশালে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু হলো। ছোটো খালার শ্বশুরবাড়ি বরিশালে। গত মাসে যখন তারা সপরিবার সেখানে যাচ্ছিলেন, আমাকেও যাওয়ার জন্য প্রস্তাব করলেন। আমি রাজি হয়ে গেলাম। কারণ, আমি তো লঞ্চ ভ্রমণের সুযোগই খুঁজছিলাম। খালাতো ভাই। সামীর মুখে লঞ্চ ভ্রমণের মজার মজার অনেক গল্প শুনেছি। তাই আমি যাওয়ার প্রস্তাবমাত্রই রাজি হয়ে যাই এবং মনের আনন্দে প্রস্তুতি নিতে শুরু করি। একঘেয়েমি জীবনের অবসরে ঘুরতে যাওয়ার মজাই আলাদা। বছরের বিভিন্ন সময়ে পছন্দমতো নানান জায়গায় ঘুরতে যাওয়া, নতুন নতুন জিনিস দেখায় আমাদের নতুন অভিজ্ঞতার সঞ্চার হয়। আর ভ্রমণ আমার কাছে বরাবরই আনন্দের। ব্যস্ত জীবন থেকে মুক্তি খুঁজে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই আমি ছুটে যাই ভ্রমণে। স্থান নির্বাচন: যথাযথ স্থান নির্বাচন একটি সুন্দর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা লাভের 'ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভ্রমণের স্থান নির্ভর করে ভ্রমণকারীর মানসিক অবস্থা, শারীরিক সক্ষমতা, পারিবারিক পরিস্থিতি, আর্থিক সচ্ছলতা ইত্যাদি বিষয়ের ওপর। আমি সাধারণত চিরাচরিত জীবন থেকে ছুটি নিয়ে প্রকৃতির বুকে ভ্রমণের উদ্দেশ্যে ছুটে যেতেই ভালোবাসি। পাহাড়, নদী, সমুদ্র ও জঙ্গল- এসবই আমার অত্যন্ত পছন্দের বিষয়। এবারে খালামণিদের সঙ্গে লঞ্চে করে বরিশাল যেতে রাজি হলাম। সামির কাছে শুনেছি লঞ্চ ভ্রমণ অনেক আনন্দদায়ক। যাত্রার সময়: উত্তেজনা সবাইকে ব্যতিব্যস্ত করায় আমরা একটু আগেই লঞ্চে ওঠার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। সন্ধ্যা ছয়টায় আমরা সদরঘাটে পৌছলাম। ঘাটের টিকিট কিনে প্রবেশ করলাম জেটিতে। দেখলাম বড়ো আকারের অনেক লঞ্চ জেটির সঙ্গে বাঁধা। প্রত্যেক অঞ্চলের লঞ্চ আলাদা আলাদা করে রাখা। কর্মচারীরা নিজ নিজ লঞ্চে ওঠার জন্য যাত্রীদের জোর গলায় ডেকে চলেছে। জেটিতে প্রচুর মানুষ। নানা গন্তব্যের যাত্রীরা নিজেদের লঞ্চটি খুঁজে নিচ্ছে। কেউ একা, কারও সঙ্গে পরিবারের সদস্যরা। হকাররা তাদের পণ্য সাজিয়ে যাত্রীদের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করছে। হকাররা শুধু জেটিতেই নয়, নৌকায় করেও বিক্রি করছে তাদের জিনিসপত্র। নদীর ওপার থেকে ছোটো ছোটো নৌকায় যাত্রীরা এপারে আসছে। যাত্রা শুরু: প্রতিটি লঞ্চই উজ্জ্বল আলোয় সজ্জিত। আমরা বড়ো একটি লঞ্চে উঠে পড়লাম। সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে নির্ধারিত স্থানে ব্যাগ ও অন্যান্য জিনিস রাখলাম। লঞ্চটি চারতলাবিশিষ্ট। জিজ্ঞেস করে জানতে পালাম এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৯০ মিটার। বেশ কৌতূহল নিয়ে লঞ্চটি ঘুরে ঘুরে দেখলাম। দোতলা ও তিনতলায় সারিবদ্ধভাবে রয়েছে বেশ কিছু বিলাসবহুল কক্ষ। নিচতলার পুরোটাই ডেক। নিচতলার ডেকের মেঝেতে যাত্রীরা চাদর বিছিয়ে নিজেদের শোয়ার ব্যবস্থা করছে। লঞ্চের পেছন দিকে ইঞ্জিনরুম, রেস্তোরাঁ ও একটি চায়ের দোকান। জানা গেল জরুরি চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। আর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে টহল দিচ্ছে আনসার সদস্যরা। আমি আশপাশের দুয়েকটি লঞ্চ ঘুরে এলাম। দেখলাম সব লঞ্চেরই প্রায় একই রকম ব্যবস্থা। লঞ্চ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা: আমার অপেক্ষার সমাপ্তি ঘটিয়ে অবশেষে রাত ৯টার দিকে লঞ্চ বরিশালের উদ্দেশে যাত্রা করল। যদিও লয় ছাড়ার সময় ছিল সাড়ে আটটা। দেরি করে যানবাহন ছাড়া আমাদের একটি অলিখিত নিয়ম। জাহাজ চলা শুরু করলে ধীরে ধীরে জেটির মানুষগুলো ছোটো হতে হতে ঝাপসা হয়ে গেল। আমরা ঘাট থেকে অনেক দূরে চলে এলাম। লঞ্চের সারেং একটু পরপর সাইরেন বাজাচ্ছেন আর সার্চলাইট ফেলে পথটা দেখে নিচ্ছেন। অনেকক্ষণ চলার পর একটি বড়ো নদী দেখতে পেলাম। তীর দেখা যায় না। নদীটির নাম শুনলাম মেঘনা। এটি বাংলাদেশের গভীরতম ও প্রশস্ততম নদী। রেলিং ধরে দাঁড়ালে যতদূর চোখ যায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ছোটো ছোটো আলোকবিন্দু চোখে পড়ে। খালা জানালেন ওগুলো মাছধরা নৌকা। আমার চোখে লঞ্চ ভ্রমণ: নৌকাগুলো দেখে 'পদ্মানদীর মাঝি' উপন্যাসের কথা মনে পড়ে গেল। কিছুক্ষণ পরপর একটি-দুটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা ভটভট আওয়াজ তুলে উলটো দিকে যাচ্ছে কিংবা আমাদের লঞ্চ সেগুলোকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে। আকাশের তারকারাজি আর নদীতে ভেসে থাকা আলোকবিন্দুগুলো অপরূপ দৃশ্য তৈরি করেছে। একসময় রাতের খাওয়ার সময় হয়ে গেল। লঞ্চে রান্না করা ইলিশ মাছ ভাজা আর ডাল দিয়ে রাতের খাওয়া সারলাম। খাওয়া শেষে বসলাম কেবিনের সামনে চেয়ারে। সবাই মিলে রাতের নীরব সৌন্দর্য উপভোগ করছি আর গল্প করছি। বরিশালের বিখ্যাত ব্যক্তিদের পরিচয়: প্রায় মধ্য রাতে আমি লঞ্চটির অবস্থা দেখতে বের হলাম। দেখলাম যাত্রীদের কেউ কেউ শুয়ে পড়েছে আবার কেউ কেউ আড্ডা দিচ্ছে। ডেকে হকার তেমন দেখা যাচ্ছিল না। খালামণি বরিশালের বিখ্যাত ব্যক্তিদের সম্পর্কে আমাদের জানালেন। আমি তো জীবনানন্দের জেলা হিসেবেই ভীষণ আনন্দে আপ্লুত ছিলাম। আজ জানলাম আরও কত মনীষীর জন্ম এই সবুজ বরিশালে। রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবী অশ্বিনীকুমার দত্ত, অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক, বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বর,'মনসামঙ্গল' কাব্যের রচয়িতা বিজয় গুপ্ত, কুসুমকুমারী দাশ ও তাঁর পুত্র জীবনানন্দ দাশ, সুফিয়া কামাল, কামিনী রায়, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো' গানের রচয়িতা আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী এবং গানটির সুরকার আলতাফ মাহমুদসহ আরও অনেকের কথা জানলাম যাঁরা এই বরিশালেরই সন্তান। গল্পের মাঝে হঠাৎ নৌপুলিশের একটি স্পিডবোট গতি কমিয়ে পাশ দিয়ে চলে গেল। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও অবৈধ মালামাল পরিবহণ। রোধে এই অন্ধকার রাতেও তারা টহল দিচ্ছে। দূরে আরও কয়েকটি লঞ্চ দেখা যাচ্ছে। সারেং মাঝে মাঝে সাইরেন বাজাচ্ছেন। একটু পরপরই সার্চলাইট ফেলে পথ দেখে নিচ্ছেন। সারেঙের কক্ষে গিয়ে দেখলাম কত রকমের প্রযুক্তি তারা ববহার করছে- রাডার, কম্পাস, জিপিএস ইত্যাদি। জীবনে ভ্রমণের তাৎপর্য: জীবনে ভ্রমণের তাৎপর্য বলে শেষ করার মতো নয়। ভ্রমণ আমাদের শরীর ও মন উভয়কে বিশেষভাবে প্রভাবিত করতে সক্ষম। ভ্রমণের ফলে একদিকে আমাদের মন যেমন জীবনের ক্লান্তি ও গ্লানি দূর করে সতেজ হয়ে ওঠে, অন্যদিকে আমাদের শরীরও সকল জড়তা কাটিয়ে সতেজতায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। এমনকি বিভিন্ন রোগমুক্তির ক্ষেত্রেও ভ্রমণের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। সে কারণেই প্রাচীন যুগ থেকে এখনো পর্যন্ত চিকিৎসকেরা বহু রোগ থেকে সেরে উঠে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার পূর্বে ভ্রমণের পরমার্শ দিয়ে থাকেন। তাছাড়া ভ্রমণ মানুষকে চিন্তাশীল হতে শেখায়। শেখায় জীবনের প্রতিকূল অবস্থার সঙ্গে যুঝে নিতে। প্রাচীনকালে রাজারা রাজ্য চালনার ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ প্রতিকূল অবস্থার সম্মুখীন হলে মুগয়ায় যেতেন। এই মৃগয়াতে শিকার অপেক্ষা ভ্রমণের গুরুত্বই বেশি থাকত। এবারকার ভ্রমণ যাত্রায় হয়তো প্রথমবার লঞ্চে চড়েছি বলে উত্তেজনায় ঘুম আসছিল না। বারবার খালামণির তাগাদায় শেষ রাতের দিকে শুয়ে পড়লাম। ভোর পাঁচটার দিকে খালামণি ডেকে তুললেন- 'এই তোরা ওঠ! আমরা বরিশাল পৌঁছে গিয়েছি।' হুড়মুড় করে উঠে পড়লাম। দেখলাম ঘাটে আরও কয়েকটি লঞ্চ বাঁধা। যাত্রীরা নেমে যাচ্ছে। ভিড় কমলে আমরাও ব্যাগগুলো নিয়ে নেমে পড়লাম। উপসংহার: লঞ্চ ভ্রমণের এই রাতটি আমার জীবনের স্মরণীয় একটি রাত হয়ে থাকবে। অসাধারণ একটি ভ্রমণের ভালোলাগা নিয়ে আমরা পা ফেললাম জীবনানন্দের শহরে। প্রকৃতির এই পরম আশ্রয় আমাকে সারা বছরের বাঁচার রসদ জুগিয়ে দিল। সেজন্য আজও রাতে ঘুমাতে গেলে লঞ্চে কাটানো রাতের সেই জোছনাময় ভ্রমণের কথা বারবার স্মৃতিতে ভেসে আসে। মধ্যরাতে বিশাল নদীবক্ষে দাঁড়িয়ে যে অনির্বচনীয় অনুভূতি আমার হয়েছিল তা জীবনে যেমন আর কখনো ফিরে আসবে না, তেমনই লেখনীতে ধারণ করা সম্ভব হবে না।
SSC বাংলা ২য় পত্র পরিচ্ছেদ ৪৯ : প্রবন্ধ রচনা CQ — Prosthuti প্রশ্নব্যাংক
SSC · বাংলা ২য় পত্র · পরিচ্ছেদ ৪৯ : প্রবন্ধ রচনা · সৃজনশীল
লঞ্চ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা।
উদ্দীপক
Barisal · 2026
উত্তর
উত্তর
উত্তর