সংবাদপত্র
উত্তর: ভূমিকা: পৃথিবীতে ঘটে চলা প্রতিদিনের বিচিত্র ঘটনাবলি সম্পর্কে জানার একমাত্র নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হচ্ছে সংবাদপত্র। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সংবাদপত্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতপক্ষে, সংবাদপত্র আধুনিক সভ্যতার এক অপরিহার্য অঙ্গ, বস্তুনিষ্ঠ ঘটনাবলির প্রমাণস্বরূপ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রেক্ষাপট, যেমন- সামাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি সম্পর্কে সংবাদপত্রের মাধ্যমেই জানা যায়। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সর্বগ্রাসী যুগেও সংবাদপত্র শিক্ষিত মানুষের কাছে একটি অনন্য যোগাযোগমাধ্যম হিসেবে কাজ করে। তবে সংবাদপত্রের পরিধি কেবল সংবাদ পরিবেশনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। জ্ঞানচর্চা, জনমত গঠন, রাজনীতি এমনকি সরকার ব্যবস্থায়ও সংবাদপত্রের ইতিবাচক ভূমিকা রয়েছে। সংবাদপত্রের গুরুত্বের কারণেই একে বলা হয়ে থাকে সমাজের দর্পণ। বস্তুত, সংবাদপত্র আধুনিক জীবনের একটি অপরিহার্য অংশ। উৎপত্তি ও বিকাশ: চীনে সংবাদপত্রের উৎপত্তি হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। একাদশ শতাব্দীতে চীনে এক ধরনের সংবাদপত্র মুদ্রিত হতো। উপমহাদেশে মোগল আমলে রাজকর্মচারীদের মধ্যে হাতে লেখা এক ধরনের সংবাদপত্র প্রকাশিত হতো। ইউরোপে ইতালির ভেনিস শহরে প্রথম সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। পরবর্তী সময়ে ১৭২১ সালে ইংল্যান্ডের রানি এলিজাবেথের শাসনকালে 'লন্ডন গেজেট' নামক একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশে ১৮১৮ সালে জেসি মার্শম্যান সর্বপ্রথম 'সমাচার দর্পণ' পত্রিকা প্রকাশ করেন। এছাড়াও বাঙালি সম্পাদক গঙ্গাধর ভট্টাচার্য 'সাপ্তাহিক বেঙ্গল গেজেট' নামে একটি পত্রিকা কলকাতা থেকে প্রকাশ করেন। পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম সংবাদপত্র ছিল 'দৈনিক আজাদী'। মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কারের ফলে দ্রুত সংবাদপত্রের প্রসার ঘটতে থাকে এবং সূচনা হয় মানব সভ্যতার এক নতুন অধ্যায়ের। ভারতবর্ষে সংবাদপত্র: অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে মুদ্রণশিল্প প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভারতবর্ষে সংবাদপত্রের যাত্রা শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৭৮০ সালে জেমস অগাস্টাস হিকির সম্পাদনায় প্রথম ইংরেজি সংবাদপত্র 'বেঙ্গল গেজেট' প্রকাশিত হয়। পরে ধীরে ধীরে ইন্ডিয়া গেজেট, ক্যালকাটা গেজেট প্রভৃতি ইংরেজি সংবাদপত্রের আত্মপ্রকাশ ঘটে। ১৮১৮ সালের এপ্রিল মাসে জন ক্লার্ক মার্শম্যানের সম্পাদনায় শ্রীরামপুর মিশন থেকে প্রকাশিত হয় প্রথম বাংলা সাময়িকপত্র 'দিগদর্শন'। একই বছরের মে মাসে প্রকাশিত হয় বাংলা ভাষার প্রথম সংবাদপত্র বলে বিবেচিত 'সমাচার দর্পণ'। তারপর ১৮৩১ সালে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় 'সংবাদ প্রভাকর'। এভাবে সংবাদপত্রের আগমনের মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায় যুক্ত হয়। সংবাদপত্রের শ্রেণিভেদ: সংবাদপত্র বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। প্রকাশের কালপরিধি বিবেচনায় সংবাদপত্র দৈনিক, অর্ধসাপ্তাহিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক ও ত্রৈমাসিক হয়ে থাকে। এছাড়াও অনেক পত্রিকা দ্বিমাসিক ও বার্ষিক রূপেও প্রকাশ হয়ে থাকে। প্রতিদিন প্রকাশিত সংবাদপত্রকে দৈনিক বলা হয়ে থাকে। দৈনিক পত্রিকায় সংবাদকে প্রাধান্য দিলেও বর্তমানে পত্র-পত্রিকাগুলোয় প্রতিদিনের খবরাখবর প্রকাশের পাশাপাশি বিভিন্ন বিভাগ খুলে সাহিত্যচর্চা, শিক্ষা, অর্থনীতি ও ক্রীড়া সংবাদ সংবলিত লেখাও ছাপা হয়ে থাকে। বাংলাদেশের সংবাদপত্র: স্বাধীনতা উত্তরকালে গণতন্ত্রের বিকাশের সাথে সাথে শ্রদেশে সংবাদ মাধ্যমের বিকাশ ঘটতে থাকে। বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য জাতীয় দৈনিকগুলো হলো- প্রথম আলো, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, যুগান্তর, মানবজমিন, সমকাল, আমাদের-সময়, জনকণ্ঠ, ভোরের কাগজ, সংবাদ, বাংলাদেশ প্রতিদিন প্রভৃতি। এছাড়াও অঞ্চলভিত্তিক বিভিন্ন দৈনিক, সাপ্তাহিক ও ত্রৈমাসিক পত্রিকা রয়েছে। ইংরেজি পত্রিকার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- দি ডেইলি স্টার, ডেইলি সান, নিউ এজ, ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, বাংলাদেশ টুডে, নিউজ টুডে, ঢাকা ট্রিবিউন প্রভৃতি। এছাড়াও অনলাইনভিত্তিক বেশকিছু পত্রিকা রয়েছে যেমন- বিডি নিউজ ২৪, নিউজ ২৪, বাংলাট্রিবিউন, পরিবর্তন, রাইজিংবিডি ইত্যাদি। বাংলাদেশের সংবাদ সংস্থা: বাংলাদেশের সরকারি সংবাদ সংস্থার নাম হলো বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা- বাসস। পাকিস্তান আমলে সংস্থাটির নাম ছিল অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস অব পাকিস্তান (এপিপি)। এছাড়াও ইউএনবি, বিএনএ, মিডিয়া সিন্ডিকেট, নিউজ মিডিয়া, আবাস প্রভৃতি। সংবাদপত্রের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা: প্রাত্যহিক জীবনে সংবাদপত্রের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। সংবাদপত্র আধুনিক সভ্যতার একটি অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে বিবেচিত। নিচে সংবাদপত্রের গুরুত্ব ও -প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আলোচনা করা হলো- জনমত গঠনে সংবাদপত্র: বিশ্বের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, বিজ্ঞান, বাণিজ্য, সাহিত্য, সংস্কৃতি, খেলাধুলা সকল ক্ষেত্রেই রয়েছে সংবাদপত্রের অবাধ বিচরণ। সংবাদপত্রের মাধ্যমেই আমরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে পারি, বৃহত্তর সমাজ ও জীবনধারার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারি। তাছাড়া সংবাদপত্র যথাযথ তথ্য ও যুক্তিনির্ভর আলোচনা প্রকাশ করে পাঠকের নিজস্ব অভিমত গঠনে ভূমিকা রাখে। সরকারের জনকল্যাণকর পদক্ষেপকে সমর্থন ও গণবিরোধী নীতির সমালোচনার মাধ্যমে এটি জনমত গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জ্ঞানচর্চায় সংবাদপত্র: কথিত আছে 'Newspaper is the store-house of knowledge [গণিত] , বর্তমান বাস্তবতায় সংবাদপত্র জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রায় সকল ক্ষেত্রকেই তার আওতায় নিয়ে এসেছে। সংবাদপত্রের মাধ্যমে পৃথিবীর সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক আলোচনা, গবেষণা এবং বিভিন্ন ঘটনার প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জানা যায়। শিশু-কিশোর ও শিক্ষার্থীদের জন্য সংবাদপত্রে থাকে আলাদা বিভাগ। কাজেই নিয়মিত সংবাদপত্র পাঠের মাধ্যমে বহুমুখী জ্ঞান অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়। পাশাপাশি ভাষাগত জ্ঞান ও দক্ষতাও বৃদ্ধি পায়। অতএব জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে সংবাদপত্র পাঠের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। সংবাদপত্র যেহেতু একটি সমাজের সামগ্রিক পরিচয়ের প্রাত্যহিক দলিল, তাই এর নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা থাকা উচিত। সংবাদপত্রকে হতে হবে অকপট ও নির্ভীক। আর এর জন্য দরকার পূর্ণ স্বাধীনতা। কিন্তু আমাদের দেশের সংবাদপত্রগুলো এখনো আশানুরূপ স্বাধীনতা লাভকরেনি। রাজনৈতিক দলগুলোর বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের সর্বদা নিজেদের স্বার্থে সংবাদপত্রকে ব্যবহার করার হীন প্রবণতা লক্ষ করা যায়। তাদের আধিপত্য বিস্তারের এই অপচেষ্টা প্রায়শই সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে খর্ব করছে। সংবাপত্রের ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা: সংবাদপত্রের ইতিবাচক ভূমিকার পাশাপাশি কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট দল বা ব্যক্তির মালিকানায় সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। এ কারণে অনেকসময় সংশ্লিষ্ট মহল সংবাদপত্রের ওপর অন্যায়ভাবে প্রভাব বিস্তার করে এবং -- ব্যক্তিগত স্বার্থে সংবাদকে ব্যবহার করতে চেষ্টা করে। তাছাড়া মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে বেশিরভাগ সংবাদপত্রই বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই জনস্বার্থ উপেক্ষিত হচ্ছে। আবার কিছু কিছু সংবাদপত্র উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে হীনস্বার্থে অপপ্রচার চালাচ্ছে এবং রাজনৈতিক বিভেদ সৃষ্টির মাধ্যমে জনমনে বিভ্রান্তির জন্ম দিচ্ছে। এইসব ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা দেশ ও জাতির জন্য কল্যাণকর নয়। সংবাদপত্রের আদর্শ: সংবাদপত্রের প্রধান কাজ হলো বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন। তাই সংবাদপত্রকে একটি আদর্শ শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকতে হয়। দেশের উন্নয়ন ও জনগণের কল্যাণের কথা চিন্তা করে সংবাদপত্র অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবে, পাশাপাশি ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও সংগ্রাম চালিয়ে যাবে। এক্ষেত্রে সংবাদপত্রকে হতে হবে নির্ভীক ও অকপট। এছাড়া ক্ষুদ্র স্বার্থ বিবেচনা না করে দেশ ও জাতির কল্যাণের কথা চিন্তা করে যথাযথ ও নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশন করার মাধ্যমে সংবাদপত্রকে পাঠকদের আস্থা অর্জন করতে হবে। মনে রাখতে হবে সমান্য একটি ভুল সংবাদ গোটা দেশের মানুষের কাছে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করতে পারে। আর তাই আদর্শ সংবাদপত্রকে সবসময় সত্যপ্রিয় ও নিরপেক্ষ হতে হবে। উপসংহার: বর্তমান সভ্য সমাজে সংবাদপত্রের অনুপস্থিতি কল্পনা করা যায় না। নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে জনগণের মঙ্গল সাধন এবং প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও রক্ষায় সংবাদপত্র বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে পারে। দলীয় স্বার্থ ও সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠতে পারলে সমাজজীবনে আধুনিক ধ্যান-ধারণা ও বিজ্ঞানমুখী চেতনার বিকাশে সংবাদপত্রের ভূমিকা হবে আরও কল্যাণমুখী।
SSC বাংলা ২য় পত্র পরিচ্ছেদ ৪৯ : প্রবন্ধ রচনা CQ — Prosthuti প্রশ্নব্যাংক
SSC · বাংলা ২য় পত্র · পরিচ্ছেদ ৪৯ : প্রবন্ধ রচনা · সৃজনশীল
সংবাদপত্র
উদ্দীপক
Rajshahi · 2019
উত্তর
উত্তর
উত্তর