পরিবেশ সংরক্ষণে বনায়ন
উত্তর: ভূমিকা: বাংলাদেশের কৃষির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপখাত বন। বৃক্ষ মানুষের জীবনের জন্যও অপরিহার্য। বৃক্ষহীন পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব অকল্পনীয়। বন আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য। কৃষি তো বটেই, আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতিও এর সাথে জড়িত। সেই সাথে জাতীয় অর্থনীতি এবং আবহাওয়া ও জলবায়ুসহ প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বনায়নের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। প্রাকৃতিক বনের স্বাভাবিক চিত্র: প্রাকৃতিকভাবে একটি বন গড়ে ওঠে হাজার বছর ধরে। বনের মাটিতে আপনা থেকেই জন্মায় শত প্রজাতির বৃক্ষ, লতাগুল্ম, পুষ্টিকর নানা শাক-সবজি ও ফলমূল। একেকটি বৃক্ষ একেক বয়সের। আর এসব বৃক্ষ আশ্রয় করে বেড়ে ওঠে নানা প্রজাতির, নানা বয়েসি লতাগুল্ম। এ নিবিড় বনের পরতে পরতে থাকে অজস্র প্রাণীবৈচিত্র্য। শত প্রজাতির পাখ-পাখালি, জীবজন্তুর অবাধ বিচরণক্ষেত্র বন। এ অভয়ারণ্যে তাদের খাবারের অভাব নেই, নেই অজানা বিপদের আশঙ্কা। বনের আরেক অবিচ্ছেদ্য অংশ ক্ষুদ্র জাতিসত্তার আদিবাসী মানুষ। শত শত বছর ধরে বনকে আশ্রয় করেই এরা বেঁচে থাকে। বাংলাদেশের বনাঞ্চল: সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে বনভূমির পরিমাণ দেশের মোট ভূমির প্রায় ১৭ শতাংশ। এর মধ্যে রয়েছে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সমুদ্র উপকূলবর্তী সুন্দরবন; চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের বনভূমি, ময়মনসিংহ, গাজীপুর ও টাঙ্গাইল জেলা এবং রংপুর ও দিনাজপুরের কিছু অঞ্চল। বনাঞ্চলের বৃক্ষনিধন ও তার প্রতিক্রিয়া: যদিও সরকারি হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের বনভূমির পরিমাণ ১৭ শতাংশ। কিন্তু সত্যিকার অর্থে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সুন্দরবন বাদ দিলে বন বলতে যা অবশিষ্ট থাকে তা সামান্যই। ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউটের মতে, এর পরিমাণ মাত্র ৫ শতাংশ। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে এ বনভূমির পরিমাণ আরও হ্রাস পাচ্ছে। শিল্প প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বনজ সম্পদ। পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃক্ষরাজি শোভিত পাহাড়গুলোর বেশিরভাগই ন্যাড়া। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বনভূমির পরিমাণ নেমে এসেছে ৩.৫ শতাংশে। এরই বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়ছে আবহাওয়ায়। বাতাস দূষিত হচ্ছে, ক্ষয়ে যাচ্ছে মাটি। বননির্ভর জীববৈচিত্র্য বিলীন হওয়ার আশঙ্কায়। খাদ্য, ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল, শক্তি ও পরিবেশ সেবার যে অংশ আসে বন থেকে, বৃক্ষ নিধনের ফলে তা সংকটের মুখোমুখি। পর্যাপ্ত বনভূমি না থাকায় অনাবৃষ্টি দেখা দিচ্ছে। ফলে দ্রুত কমে যাচ্ছে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর। বিলীন হয়ে যাচ্ছে অতুলনীয় সবুজ সৌন্দর্য। বনায়নের প্রয়োজনীয়তা ও উপায়: জাতীয় অর্থনীতি ও পরিবেশের ভারসাম্য টিকিয়ে রাখতে দেশের বনজ সম্পদ সংরক্ষণ, সম্প্রসারণ ও বনজ সম্পদের উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। আমাদের নগর জীবন থেকে যেন ছায়াশীতল-স্নিগ্ধতা একেবারেই হারিয়ে গেছে। প্রাকৃতিক পরিবেশের পাশাপাশি নগরের সৌন্দর্যও হুমকির মুখে। এক্ষেত্রে পরিকল্পিত বনায়নের বিকল্প নেই। আর বাংলাদেশে রয়েছে বনায়নের বিপুল সম্ভাবনা। এ সম্ভাবনাকে সুষ্ঠুভাবে কাজে লাগাতে হবে। এর জন্য যা করণীয় তা হলো: ১. পাহাড়ের ঢাল, সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চল, নদীর কিনারা ও সড়কের দু পাশে গাছ লাগানোর ব্যবস্থা করতে হবে; ২. নির্বিচারে বনভূমির গাছ কাটা রোধ করতে হবে; ৩. অপরিণত গাছ কাটা বন্ধ করতে হবে; ৪. 'প্রয়োজনে গাছ কাটা হলে সে অঞ্চলে নতুন চারা গাছ লাগাতে হবে; ৫. বনভূমি থেকে কাঠের চোরাচালান বন্ধ করতে হবে; ৬. বিদেশি বা আগ্রাসী প্রজাতি দিয়ে কৃত্রিম বনায়ন না করে দেশীয় অর্থকরী বৃক্ষরোপণের ব্যবস্থা করতে হবে; ৭. গ্রামাঞ্চলে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির অংশ হিসেবে বৃক্ষরোপণে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণে উৎসাহ দিতে হবে। বিনামূল্যে সরবরাহ করতে হবে বীজ ও চারা; ৮. গ্রামবাসীকে বসতভিটার চারপাশে খাদ্য, ফল, জ্বালানি ইত্যাদি আহরণ উপযোগী বিভিন্ন ধরনের বৃক্ষরোপণ করতে হবে; ৯. সরকারি ও বেসরকারি সহায়তায় বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যায় অংশগ্রহণকারীদের আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ দিয়ে উৎসাহিত করতে হবে; ১০. সামাজিক বনায়ন সম্পর্কিত সকল বিষয় তদারকি করার জন্য ওয়ার্ড মেম্বারের নেতৃত্বে শিক্ষক, সমাজকর্মী, ইমাম প্রমুখের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করতে হবে। বনায়নের লক্ষ্যে গৃহীত পদক্ষেপ: বাংলাদেশে বনজ সম্পদের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক, বিশেষ করে সরকারি বনভূমিতে। তাই সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বনায়নের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন মেয়াদে জনগণকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। জনসাধারণের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে চারা। তবে খাংলাদেশের সরকারি বনভূমিতে যে বনায়ন কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে তা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। যেমন-দেশীয় প্রজাতির গাছ নিশ্চিহ্ন করে সেখানে রাবার, সেগুন, আকাশিয়া প্রভৃতির শিল্প বন তৈরি করা হচ্ছে। বিদেশি প্রজাতির গাছের সাথে ক্ষতিকর অনেক কীটপতঙ্গ আসে। এ ধরনের গাছ মাটি থেকে পানি শোষণ করে নেয় বলে আশপাশের জমিতে পানির পরিমাণও কমে যায়। পার্বত্য চট্টগ্রাম, মধুপুর প্রভৃতি পার্বত্য এলাকায় রাবার চাষ এবং বাণিজ্যিক ও শিল্প বনায়নের কারণে অধিক মাত্রায় মাটিক্ষয় ও পানির স্বল্পতা দেখা দিয়েছে। এসব অঞ্চলে বসবাসরত আদিবাসীরা বনাঞ্চল থেকে তাদের প্রয়োজনীয় শাক-সবজি, ফলমূল ও নির্মাণ সামগ্রী সংগ্রহ করতে পারছে না। অনেক ক্ষেত্রে ঐতিহ্যগত ভূমি অধিকার থেকেও তারা বঞ্চিত হচ্ছে। উপসংহার: প্রাণীর অস্তিত্ব ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গাছপালার কোনো বিকল্প নেই। গাছ প্রস্বেদন প্রক্রিয়া ও বাষ্পীভবনের মাধ্যমে আবহাওয়া বিশুদ্ধ রাখে। মাটির উর্বরতা বাড়ায়, মাটির ক্ষয় রোধ করে। ঝড়-ঝঞ্ঝা থেকে রক্ষা করে প্রকৃতিকে, বন্যা প্রতিরোধ করে। অর্থাৎ মানুষের বসবাস, উপযোগী ভারসাম্যপূর্ণ পৃথিবী বৃক্ষেরই অবদান। তাই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের হাত থেকে দেশকে বাঁচানো ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বনায়নের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর বনায়নের জন্য প্রয়োজন জনগণের সচেতনতা এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা। পরিকল্পিত ও সঠিক বনায়নের মাধ্যমেই নৈসর্গিক সৌন্দর্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব।
SSC বাংলা ২য় পত্র পরিচ্ছেদ ৪৯ : প্রবন্ধ রচনা CQ — Prosthuti প্রশ্নব্যাংক
SSC · বাংলা ২য় পত্র · পরিচ্ছেদ ৪৯ : প্রবন্ধ রচনা · সৃজনশীল
পরিবেশ সংরক্ষণে বনায়ন
উত্তর