নীলগঞ্জ গ্রামে "১৯৭১'-এর মুক্তিযুদ্ধের প্রতিফলন বর্ণনা করো।
উত্তর: বাঙালি জাতির ইতিহাসের এক গৌবরময় অধ্যায় মুক্তিযুদ্ধ। বিশ্বমানচিত্রে খুব কম জাতিরই এমন অর্জন রয়েছে। বাঙালি জাতীয়তাবোধের প্রথম সোপান রচিত হয়েছিল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে। এরই ধারাবাহিকতায় নানা আন্দোলন-সংগ্রাম পেরিয়ে তারা উপনীত হয়েছিল মুক্তির সংগ্রামে অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক অসংখ্য সাহিত্য রচনা করেছেন নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। সেগুলোর মধ্যে '১৯৭১' একটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। '১৯৭১' উপন্যাসে লেখক জনবিচ্ছিন্ন ক্ষুদ্র এক শান্ত গ্রামকে উপন্যাসের পটভূমি করেছেন। গ্রামটির নাম নীলগঞ্জ। এ গ্রামের মানুষ যুদ্ধ বোঝে না, সংগ্রাম কী তা জানে না। অথচ সেই গ্রামেই একদিন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আগমনে সেখানকার মানুষের জীবনে বিপর্যয় নেমে আসে। লেখক স্পষ্ট করে কোথাও বলেননি যে নীলগঞ্জ গ্রামে মুক্তিবাহিনী আছে, শুধু সন্দেহের বেড়াজাল বুনে গেছেন উপন্যাসজুড়ে। সন্দেহের বশেই নীলগঞ্জ গ্রামে হানাদার বাহিনীর অধিনায়ক মেজর এজাজের নেতৃত্বে অভিযান শুরু হয়, যেটাকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রতিচ্ছবি বলা যায়। '১৯৭১' উপন্যাসের কাহিনিতে বলা হয়েছে নীলগঞ্জ গ্রামে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একদল জোয়ান পাকিস্তানি এক সেনাকে বন্দি করেছে, যার নাম মেজর বখতিয়ার। তাকে উদ্ধার করতেই মেজর এজাজ এ গ্রামে অভিযান চালায়। অভিযানে প্রথম থেকেই তারা গ্রামবাসীর ওপর আগ্রাসী হয়ে ওঠে। প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার আজিজকে ধরে এনে অমানবিক অত্যাচার করে। একপর্যায়ে তারা তাকে গুলি করে হত্যা করে। শুধু এটিই নয়, তারা অসংখ্য বর্বরোচিত ঘটনা ঘটনায়। গ্রামবাসীকে ভয়ভীতি দেখানোর জন্য এবং ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে কৈবর্ত মনা ও বিরুকে সবার সামনে গুলি করে হত্যা করে। নীলগঞ্জের সম্ভ্রান্ত হিন্দু নীলু সেনকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে হত্যা করে। বর্বর পাকিস্তানিরা দেশের বিভিন্ন স্থানে গণহত্যার যে নজির স্থাপন করেছিল নীলগঞ্জেও তাই ঘটেছে। মধুবনের জঙ্গলা মাঠের বিলকে তারা বধ্যভূমি হিসেবে ব্যবহার করেছে। শুধু পুরুষ নয়, দখলদার পিশাচ হানাদার বাহিনীর হাত থেকে গ্রামের মেয়েরাও রক্ষা পায়নি। সফদরউল্লাহর স্ত্রী ও শ্যালিকাকে তারা ধর্ষণ করে, লাঞ্ছিত করে। মুক্তিযুদ্ধে নারী লাঞ্ছনার দিকটি এখানে প্রতিফলিত হয়েছে। তবে অন্যায় ও শোষণ কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয় না। মানুষ একসময় অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। সফদরউল্লাহ তার স্ত্রী ও শ্যালিকার লাঞ্ছনার প্রতিশোধ নিতে দা হাতে বেরিয়ে পড়ে। আজিজ মাস্টার লজ্জাজনক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে এবং অপমানিত হওয়ার চেয়ে মৃত্যুকে বেছে নেয়। বিবেকের তাড়নায় ও প্রতিবাদস্বরূপ রফিক মেজর এজাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে মৃত্যুবরণ করে। প্রত্যক্ষ কোনো প্রতিরোধ না হলেও এ উপন্যাসে দেশপ্রেমের চেতনাবোধ জাগ্রত হয় বেশকিছু চরিত্রে, যা মূলত বাংলাদেশে মুক্তিসংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। এছাড়াও এ দেশীয় রাজাকারদের উল্লেখ রয়েছে এ উপন্যাসে। তাই বলা যায়, '১৯৭১' উপন্যাসের নীলগঞ্জ গ্রাম আসলে মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশেরই প্রতিচ্ছবি।
SSC বাংলা ১ম পত্র ১৯৭১ (উপন্যাস) CQ — Prosthuti প্রশ্নব্যাংক
SSC · বাংলা ১ম পত্র · ১৯৭১ (উপন্যাস) · সৃজনশীল
নীলগঞ্জ গ্রামে "১৯৭১'-এর মুক্তিযুদ্ধের প্রতিফলন বর্ণনা করো।
উত্তর