না, পশ্চিম পাকিস্তানিদের বৈষম্য কেবল অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল এমন নয়। অর্থনৈতিক ক্ষেত্র ছাড়াও যেসকল ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তানিরা বৈষম্য করত তা নিম্নের আলোচনায় বর্ণনা করা হলো-
পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিম পাকিস্তান সামরিক ক্ষমতায় চরম অবহেলা করেছে। ১৯৫৫ সালে সামরিক বাহিনীতে ২২১১ জন কর্মকর্তার মধ্যে ৮২ জন বাঙালি ছিলেন। ১৯৬৬ সালের এক জরিপে দেখা যায়, সামরিক বাহিনীতে উচ্চ পর্যায়ে ১৭ জন শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তার মাত্র ১ জন বাঙালি ছিলেন। এ সময় সামরিক অফিসারদের মধ্যে ৫% বাঙালি ছিলেন। প্রশাসনিক দিকে পাকিস্তানের চালিকা শক্তি ছিল সিভিল সার্ভিস কর্মকর্তাগণের কাছে। ১৯৬২ সালে পাকিস্তানের যে মন্ত্রণালয় গঠিত হয় তার শীর্ষস্থানীয়দের ৯৫৪ জনের মধ্যে মাত্র ১১৯ জন বাঙালি ছিলেন। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের ৪২০০০ কর্মকর্তার মধ্যে ২,৯০০ জন কর্মকর্তা বাঙালি ছিলেন। পশ্চিম পাকিস্তান এদেশের শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতাদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালায়। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন দিতে বিলম্ব এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করলেও তারা ক্ষমতা ছাড়তে চায়নি। নির্বাচনোত্তর ক্ষমতা হস্তান্তরের এ রাজনৈতিক সংকট পাকিস্তানের পূর্ব বাংলার প্রতি রাজনৈতিক বৈষম্যেরই নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। সামাজিক অবকাঠামোগত দিক থেকে পূর্ব পাকিস্তান অনুন্নত ছিল। হাসপাতাল, অফিস-আদালত, স্কুল- কলেজ, রাস্তাঘাট, ডাকঘর, টেলিফোন প্রভৃতি অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানে। পশ্চিম পাকিস্তান নানাভাবে পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা ভাষাকে দমিয়ে উর্দু ভাষা ও আরবি ভাষার মাধ্যমে, শিক্ষা গ্রহণের উপদেশ দেয়। শিক্ষার ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের কোনো উন্নয়ন তারা করেনি। ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির দিক থেকে পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানকে চরমভাবে অবহেলা করেছে। যেমন— পূর্ব পাকিস্তানের ৫৬% বাঙালি থাকা সত্ত্বেও পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাংলা ভাষাকে মুছে ফেলতে চেয়েছিল ।
উপরিউক্ত আলোচনার পরিশেষে বলা যায় যে, পশ্চিম পাকিস্তানিরা কেবল অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই নয় বরং সর্বক্ষেত্রেই পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ প্রদর্শন করে নিজেদের সমৃদ্ধি ঘটিয়েছিল ।