উদ্দীপকে 'খ' দেশের সরকার 'যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার' ব্যবস্থা বিদ্যমান এই সরকার ব্যবস্থার সাফল্যের শর্তাবলী আলোচনা করা হলো :
১. যুক্তরাষ্ট্রীয় মনোভাব : যুক্তরাষ্ট্রের সাফল্যের প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো 'যুক্তরাষ্ট্রীয় মনোভাব'। যুক্তরাষ্ট্রীয় মনোভাবের রয়েছে দুটি দিক-(১) কেন্দ্রমুখী প্রবণতা (Centripetal tendency) এবং (২) কেন্দ্রবিমুখী প্রবণতা (Centrifugal tendency)। ঐক্যবদ্ধ হবার জন্য ইচ্ছার পাশাপাশি যখন প্রদেশ বা অঞ্চলগুলোর মধ্যে নিজ নিজ স্বাতন্ত্র্য রক্ষার বাসনাও প্রবল থাকে তখন 'যুক্তরাষ্ট্রীয় মনোভাব' সৃষ্টি হয়।
২. ভৌগোলিক সান্নিধ্য: ভৌগোলিক সান্নিধ্যের ফলে জনগণের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ হবার ইস্ক্য দেখা দেয়। অপরদিকে ভৌগোলিক অসংলগ্নতা ঐক্যবদ্ধ হবার পথে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। স্বাধীনতা-পূর্ব কালে বর্তমান আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের ১৩টি অঙ্গরাজ্য পাশাপাশি অবস্থিত থাকায় ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে স্বাধীনতা অর্জন এবং একটি যুক্তরাষ্ট্র গঠন করে। ধর্মের বন্ধন থাকা সত্ত্বেও ভৌগোলিক অসংলগ্নতার কারণে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র ভেঙে যায় এবং পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জনগণ স্বাধীন হয়।
৩. ধর্মীয় ঐক্য: যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্গত প্রদেশ বা অঙ্গরাজ্যের জনগণ একই ধর্মাবলম্বী হলে ভালো হয়। তবে শুধু ধর্মের বন্ধনই যথেষ্ট নয়। কেননা ধর্মের বন্ধনে উদ্বুদ্ধ হয়ে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র গঠিত হলেও ভাষা এবং সংস্কৃতিগত বন্ধন না থাকায় এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য দেখা দেয়ায় ১৯৭১ সালে পাকিস্তান নামক যুক্তরাষ্ট্রের মৃত্যু ঘটে।
৪. ভাষা ও সংস্কৃতিগত ঐক্য: যুক্তরাষ্ট্রের প্রদেশ বা অঙ্গরাজ্যগুলোর জনগণের মধ্যে ভাষা ও সংস্কৃতিগত ঐক্য থাকা প্রয়োজন। যখন বিভিন্ন প্রদেশ বা অঙ্গরাজ্যের জনগণ একই ভাষায় কথা বলে এবং একই সাহিত্য ও সংস্কৃতি তাদেরকে আকৃষ্ট ও অনুপ্রাণিত করে তখন তাদের মধ্যে জাতীয় ঐক্যভাব গড়ে ওঠে। ভাষা ও সংস্কৃতিগত বিভিন্নতার কারণেই পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র ভেঙে যায় এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হয়।
৫. রাজনৈতিক সচেতনতা: যুক্তরাষ্ট্র সর্বাপেক্ষা জটিল শাসনব্যবস্থা। এর সফলতার জন্য তাই জনগণের রাজনৈতিক শিক্ষা ও সচেতনতা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সজাগতা এবং আত্মত্যাগের মনোভাব থাকা প্রয়োজন।
৬. সৎ ও সুযোগ্য নেতৃত্ব: সৎ, দেশপ্রেমিক ও সুযোগ্য নেতৃত্ব ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র সফল হয় না। জর্জ ওয়াশিংটন, ম্যাডিসন, হ্যামিল্টন, জেফারসন ও লিঙ্কনের মত সুযোগ্য ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতারা পৃথিবীর বুকে প্রথম যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার প্রতিষ্ঠা এবং তাসফল করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
৭. সাংবিধানিক প্রাধান্য: সাংবিধানিক প্রাধান্য না থাকলে যুক্তরাষ্ট্র সফল হতে পারে না। কেননা যুক্তরাষ্ট্রে সংবিধানইহচ্ছে জনগণের রক্ষক ও অভিভাবক।
৮. স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার বিভাগ: সংবিধানের প্রাধান্য নিষ্ঠার সাথে স্বীকৃত ও প্রতিপালিত হচ্ছে কিনা তা দেখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে স্বাধীন, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ও নিরপেক্ষ যুক্তরাষ্ট্রীয় আদালত গঠন এবং একে সংবিধানের রক্ষক ও অভিভাবক হিসেবে প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালনের দায়িত্ব প্রদান করা উচিত।
৯. লিখিত ও দুষ্পরিবর্তনীয় সংবিধান: সংবিধানের শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রাধান্য রক্ষার জন্য, সংবিধানকে স্পষ্ট করে তোলার জন্য তা লিখিত ও দুষ্পরিবর্তনীয় হতে হবে।
১০. দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা: যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রদেশ বা অঙ্গরাজ্যগুলোর জন্য দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা থাকাই বাঞ্ছনীয়। উচ্চকক্ষ প্রদেশ বা অঙ্গরাজ্যের স্বার্থ দেখাশোনা করবে।
১১. অভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আশা-আকাঙ্ক্ষা: যুক্তরাষ্ট্রের সকল অঙ্গরাজ্য বা প্রদেশের জনগণের মধ্যে অভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আশা-আকাঙ্ক্ষা থাকা বাঞ্ছনীয়।
১২. রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগত সাদৃশ্য: যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার ব্যবস্থায় কেন্দ্র ও প্রদেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগত সাদৃশ্য থাকা বাঞ্ছনীয়।
১৩. আইন মেনে চলার মনোভাব: যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় নাগরিকদের আইন মেনে চলার মনোভাব গড়ে তুলতে হবে।
১৪. সমতা: যুক্তরাষ্ট্রের প্রদেশগুলোর মধ্যে সমতা বজায় থাকা একান্ত প্রয়োজন। কেননা জনসংখ্যা ও সম্পদের ক্ষেত্রে বিরাট বৈষম্য বিদ্যমান থাকলে প্রদেশগুলোর মধ্যে ক্ষমতা ও সম্পর্কের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।
১৫. আর্থিক সামর্থ্য: যুক্তরাষ্ট্র শুধু জটিল সরকার পদ্ধতিই নয় বরং তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল সরকারব্যবস্থা। সুতরাং পরিচালনা ও প্রতিপালনের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সামর্থ্য থাকতে হবে।