উদ্দীপকে উল্লিখিত ঘটনা তথা ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির বিজয়ের ইতিহাস প্রতিরোধ আর বীরত্বের গৌরবে ভাস্বর। দীর্ঘ নয় মাসের এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লক্ষ শহিদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে এ বিজয়।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার মধ্য দিয়ে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। জেনারেল এম এ জি ওসমানীর নেতৃত্বে সাবেক ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, সাবেক ইপিআর, পুলিশ, আনসার, ছাত্র, যুবক, কৃষকসহ যুদ্ধে ইচ্ছুক লোকদের নিয়ে গঠিত হয় মুক্তিবাহিনী। এ বাহিনী মূলত দুইটি পদ্ধতি অবলম্বন করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে মোকাবিলা শুরু করে। এ পদ্ধতিগুলো হলো:
১. অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধ ও যুদ্ধ: বর্বর হানাদার বাহিনী বাংলার দখলকৃত অঞ্চলসমূহে নির্বিচারে গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ প্রভৃতি জঘন্যতম অপকর্মে লিপ্ত হয়। বাঙালি যুবক সম্প্রদায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গ্রাম-গঞ্জ ও শহরে গোপনে সংগঠিত হয়ে পাক বাহিনীকে গেরিলা পদ্ধতিতে পর্যুদস্ত করতে থাকে।
২. যৌথ বাহিনীর আক্রমণ: মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এক পর্যায়ে ভারত সরকার সেনাবাহিনী দিয়ে বাংলাদেশকে সহায়তা করতে থাকে। এ বাহিনীটি মিত্র বাহিনী নামে পরিচিত ছিল। পাকিস্তানি বাহিনীকে কোণঠাসা করার লক্ষ্যে ২১ নভেম্বর মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ কমান্ড গঠন করা হয়। এ যৌথ বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ তৎপরতা শুরু করলে হানাদার বাহিনীর পরাজয় অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে।
১২ ডিসেম্বর ঢাকার বিভিন্ন সামরিক অবস্থান ও স্থাপনার ওপর যৌথবাহিনী বিমান হামলা চালায় এবং চতুর্দিক থেকে তারা ঢাকা অভিমুখে রওনা হয়। এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী রণাঙ্গণে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ শুরু হয়ে যায়। ১৪ ডিসেম্বরের মধ্যে ঢাকা ব্যতীত দেশের অন্য সব বড় শহর ও সেনানিবাসে পাকবাহিনী আত্মসমর্পণ করে। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সবচেয়ে কালো দিন। নিশ্চিত পরাজয়কে সামনে রেখে হতবিহ্বল পাক বাহিনী বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের একটি বড় অংশকে রাজাকার ও আলবদরদের সহায়তায় হত্যা করে বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্য করার ঘৃণ্য চক্রান্ত বাস্তবায়ন করে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর। ওই দিন পাকিস্তানি বাহিনী আর কোনো গত্যন্তর না পেয়ে তাদের শোচনীয় পরাজয় মেনে নেয় এবং যৌথবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। এর মাধ্যমে পৃথিবীর বুকে চিত্রিত হয় লাল-সবুজের মানচিত্র।