ব্রিটিশ আমল থেকেই পূর্ববাংলা ছিল অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাবঞ্চিত। পাকিস্তান আমলে এই বঞ্চনা আরো বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তানে পোশাক কারখানা ছিল ১১টি আর পশ্চিম পাকিস্তানে ছিল ৯টি। ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানের পোশাক কারখানা বেড়ে দাঁড়ায় ২৬টিতে। আর পশ্চিম পাকিস্তানের বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১৫০টিতে। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে পূর্ব বাংলার সৈন্যসংখ্যা ছিল মাত্র ৫%। এরমধ্যে কমান্ড পদে ছিলেন হাতেগোনা মাত্র কয়েকজন। পশ্চিম পাকিস্তানিরা কর্মরত বাঙালি সৈনিকদের সাথে যথার্থ ব্যবহার করতো না; তাদের সাথে বিমাতাসুলভ আচরণ করতো। তারা পূর্ব পাকিস্তানিদের যুদ্ধে যাবার অযোগ্য বলে বিবেচনা করতো।
জনসংখ্যা বিবেচনায় পূর্ব পাকিস্তান ছিল সমগ্র পাকিস্তানের বৃহত্তর অংশ। অথচ, শাসন ক্ষমতা কুক্ষিগত ছিল পশ্চিম পাকিস্তানকেন্দ্রিক। রাজনৈতিক ক্ষমতা কুক্ষিগতকরণের এই ষড়যন্ত্র ছিল পাকিস্তান সৃষ্টির শুরু থেকেই। আর এই ষড়যন্ত্রের প্রধান নায়ক ছিল পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী। পূর্ব পাকিস্তানের কোনো ব্যক্তি যখনই রাষ্ট্রের কোনো পদে নেতা নির্বাচিত হতেন ঠিক তখনই তারা নানারকম তালবাহানা শুরু করতো। কোনো না কোনো অজুহাতে তার পদচ্যুতি ঘটাতো এই পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী। ১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খান পাকিস্তানের শাসন ক্ষমতা দখল করেন। দীর্ঘ ১১ বছর পাকিস্তানে চলে তার স্বৈরশাসন। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর এ অবৈধ ক্ষমতা দখল, শোষণ ও নির্যাতনের ফলে পূর্ব পাকিস্তানের সাথে পশ্চিম পাকিস্তানের দূরত্ব বাড়তে থাকে। আইয়ুব খানের শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় ছাত্রসমাজ, গঠন করে সংগ্রাম পরিষদ। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আন্দোলন একসময় রূপ নেয় গণআন্দোলনে। গণআন্দোলনের মুখে আইয়ুব খান ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ পদত্যাগ করে। ক্ষমতা গ্রহণ করেন তারই উত্তরসূরী জেনারেল ইয়াহিয়া খান। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর পূর্ব পাকিস্তানের উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানে ইতিহাসের ভয়াবহতম জলোচ্ছ্বাস। জলোচ্ছ্বাসের আঘাতে ৫ লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু হয়। জলোচ্ছ্বাসের পরেও যারা বেঁচে ছিলেন তাদেরও অনেকে খাদ্য ও পানির অভাবে মৃত্যুবরণ করে। ইতিহাসের ভয়াবহতম এ দুর্যোগেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কোনো ধরনের ত্রাণকার্য পরিচালনা করেনি। জলোচ্ছ্বাসে বিধ্বস্ত পূর্ব পাকিস্তানিদের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অমানবিকতা আর নিষ্ঠুরতা পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষদের বিক্ষুব্ধ করে তোলে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের এ হামলাকে ইতিহাসের ভয়াবহতম গণহত্যা বলা হয়। হত্যাকান্ডের খবর বিশ্ববাসী যাতে জানতে না পারে সে লক্ষ্যে তারা আগে থেকেই বিদেশি সাংবাদিকদেকদের ঢাকা ত্যাগে বাধ্য করে। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে হামলা চালায়। জগন্নাথ হল পুরোপুরিভাবে ধ্বংস করে। এতে প্রায় ৭০০ ছাত্র নিহত হয়। মধ্যরাতের আগেই তারা সমস্ত ঢাকা শহর জ্বালিয়ে দেয়। ওই রাতেই পাকিস্তানিদের হাতে বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হন। গণহত্যা চালানোর পর পাকিস্তানিরা ১০ এপ্রিলের মধ্যে সারাদেশ তাদের দখলে আনার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। কিন্তু সামরিক বাহিনীর বাঙালি সদস্য, সাধারণ ছাত্রজনতা ও সাধারণ মানুষ তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তারা চট্টগ্রাম কুষ্টিয়া, পাবনা, বগুড়া ও দিনাজপুর বিদ্রোহের মাধ্যমে শহরগুলোর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। পরবর্তীতে পাকিস্তানিরা বিমান হামলার মাধ্যমে এ সমস্ত এলাকার নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে নেয়। বীর বাঙালি জীবনের বিনিময়ে অঞ্চলগুলোর পুনঃনিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের মুজিবনগরে প্রতিষ্ঠিত হয় অস্থায়ী সরকার। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হন এই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ সরকারের প্রথম রাষ্ট্রপতি। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পান সৈয়দ নজরুল ইসলাম। আর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব অর্পিত হয় তাজউদ্দিন আহমেদের উপর। বাংলাদেশের প্রথম প্রতিষ্ঠিত সরকার দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে শপথ গ্রহণ করেন। শুরু হয় অনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব পালন। এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে পঠিত হয় স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। ২৬ মার্চ ১৯৭১ থেকে বাংলাদেশেকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়।