সংবিধান একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন। বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রব্যবস্থা নির্দিষ্ট সংবিধান দ্বারা পরিচালিত। কেননা সংবিধান হলো রাষ্ট্রের জীবন পদ্ধতি; যা রাষ্ট্র নিজেই বেছে নিয়েছে। রাষ্ট্রের নাগরিকদের সব অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা এবং রাষ্ট্রের প্রতি তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সংবিধান নির্ধারণ করে দিয়েছে। রাষ্ট্রের সংবিধান শুধু একটি বিধিবদ্ধ আইন নয়, বরং তা একটি জনসমষ্টির প্রগতির নিদর্শন। সংবিধানে বর্ণিত মৌলিক অধিকারসমূহ একজন মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত। কেননা, মৌলিক অধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে একজন মানুষের মানবসত্তা বিকশিত হয়। অন্যদিকে মৌলিক অধিকার প্রয়োগের স্বাধীনতা যখন কারো দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয়, তখন মানুষের সাধারণ জীবনযাত্রার মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
মৌলিক অধিকার সম্পর্কে জানতে হলে প্রথমত 'অধিকার ও মানবাধিকার' সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান জরুরি। সাধারণ অর্থে অধিকার হলো, 'মানুষের আত্মবিকাশের জন্য কতিপয় সুযোগ-সুবিধার দাবি, যে দাবির হয় নৈতিক, না হয় আইনগত ভিত্তি রয়েছে।' অন্যদিকে মানব পরিবারের সব সদস্যের জন্য সার্বজনীন, সহজাত অধিকারই হলো মানবাধিকার। মানবাধিকার প্রতিটি মানুষের এমন অধিকার যেটা তার জন্মগত ও অবিচ্ছেদ্য। আর যখন কতিপয় মানবাধিকারকে কোনো দেশের সংবিধানে লিপিবদ্ধ করা হয় এবং সাংবিধানিক নিশ্চয়তা দ্বারা সংরক্ষণ করা হয়, তখন তাদের মৌলিক অধিকার বলে। সাধারণত মৌলিক অধিকারগুলোর সবই মানবাধিকার। অর্থাৎ সব মৌলিক অধিকার মানবাধিকার, কিন্তু সব মানবাধিকার মৌলিক অধিকার নয়। বস্তুত মৌলিক অধিকার রাষ্ট্রের ওপর বাধানিষেধ আরোপ করে এবং রাষ্ট্রের কাজের পরিধি বা সীমানা নির্দিষ্ট করে দেয়।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধানের ১১টি ভাগ রয়েছে। মৌলিক অধিকার সংশ্লিষ্ট বিধান তৃতীয় ভাগে আলোচিত হয়েছে। অনুচ্ছেদ ২৭ থেকে ৪৪ পর্যন্ত মোট ১৮টি মৌলিক অধিকার সংবিধানে সন্নিবেশিত হয়েছে। মৌলিক অধিকারগুলো সাধারণত সংবিধানের মৌলিক কাঠামো হিসেবে পরিগণিত হয়। আর এরূপ অধিকার পরিবর্তন, সংযোজন বা বিয়োজন অযোগ্য। অর্থাৎ রাষ্ট্র চাইলে এ অধিকারগুলো সংযোজন বা বিয়োজন করতে পারবে না।
পৃথিবীর যেকোনো সংবিধানে মৌলিক অধিকারকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মৌলিক অধিকারের আকার-আকৃতি বা ধরন বিভিন্ন রাষ্ট্রে ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতির। তবে বিশেষ কিছু অধিকারকে প্রত্যেক রাষ্ট্রই মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। যেমন চলাফেরার স্বাধীনতা, বাক স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার ইত্যাদি। ভারতীয় সংবিধানের তৃতীয় অধ্যায়ের অনুচ্ছেদ ১২ থেকে ৩৫ এরমধ্যে মৌলিক অধিকার লিপিবদ্ধ হয়েছে। ভারতীয় সংবিধানে উল্লিখিত কতিপয় মৌলিক অধিকার হলো সাম্যের অধিকার, স্বাধীনতার অধিকার, শোষণের বিরুদ্ধে অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার, সংস্কৃতি ও শিক্ষাবিষয়ক অধিকার ইত্যাদি। পাকিস্তানের সংবিধান নাগরিকের চলাফেরার স্বাধীনতা, মেলামেশার স্বাধীনতা, বাক স্বাধীনতা, ধর্ম প্রচারের স্বাধীনতাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে মর্যাদা দিয়েছে। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কার সংবিধানে বিনামূল্যে শিক্ষা পাওয়ার অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানেও বাক স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিষ্ঠুর দন্ড প্রদান নিষিদ্ধকে মৌলিক অধিকার হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
মৌলিক অধিকারসমূহ রক্ষা বা বলবৎ করার উপায়
বাংলাদেশ সংবিধানে মৌলিক অধিকার রক্ষা বা বলবৎ করার উপায়ও নির্দেশিত রয়েছে। এগুলো হলো:
১. বাংলাদেশ সংবিধানের ২৬ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, জাতীয় সংসদ মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে কোনো আইন প্রণয়ন করবে না। মৌলিক অধিকারের সাথে সামঞ্জস্যহীন কোনো আইন প্রণীত হলে তা যতটুকু সামঞ্জস্যহীন ততটুকু বাতিল বলে গণ্য হবে।
২. আইনানুযায়ী ব্যতীত বাংলাদেশের কোনো নাগরিককে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা হতে, ব্যক্তিগত সম্পত্তি ভোগের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। সংবিধানের ৩২নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, আইনের কর্তৃত্ব ব্যতীত কেউ জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তি ভোগের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে না। হাইকোর্ট বিভাগ মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী যে কোনো পদক্ষেপকে বাতিল ঘোষণা করতে পারবে।
৩. বাংলাদেশ সংবিধানের ৪৪ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি মৌলিক অধিকার বলবৎ করার জন্য হাইকোর্ট বিভাগে আবেদন করতে পারবেন। মৌলিক অধিকার বলবৎ করার জন্য সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগ কোনো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আবেদনক্রমে মৌলিক অধিকার বলবৎ করার জন্য যে কোনো ব্যক্তি বা সংস্থাকে নির্দেশ দিতে পারবে।
৪. মৌলিক অধিকার রক্ষার অন্যতম রক্ষাকবচ হলো বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনা ক্ষমতা। জাতীয় সংসদ কর্তৃক প্রণীত কোনো আইন যদি মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী হয় তাহলে সুপ্রিম কোর্ট তা বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার মাধ্যমে বাতিল ঘোষণা করতে পারবে।