উদ্দীপকে উল্লিখিত ঘটনাটি আমার পাঠ্যপুস্তক 'পৌরনীতি ও সুশাসন'এ উল্লেখিত "জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্ব" ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। নিম্নে বর্ণনা করা হলো :
১৯২৮ সালে 'নেহেরু বিপোদে প্রকাশির মরার পর থেকে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক ক্রমশ তিক্ততর হতে থাকে। ১৯৩৭ সালের সাধারণ নির্বাচনের মূল প্রদেশকালোরা মন্ত্রিসভায় মুসলমান প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে কংগ্রেস ও মুসলমা তিক্ততার সৃষ্টি হলে ভারতীয় মুসলিম জনগণ তাদের ভাগ্য সম্পর্কে নিরাশ হয়ে পড়ে। এ সময়ে মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ বিধেয় করে মি. জিন্নাহ্ অনুভব করেন যে, অখণ্ড ভারতে মুসলমানদের ভাগ্য কোনো দিনই নিশ্চিত হবে না। এর ফলে তিনিতোষ 'দ্বিজাতি তত্ত্ব' উদ্ভাবন করেন।
মি. জিন্নাহ ঘোষণা করেন যে, "ইসলাম ও হিন্দুবাদের প্রকৃত স্বরূপ আমাদের হিন্দু বন্ধুরা কেন বুঝতে পারেন না, আমি তা বুঝি না। ইসলাম ও হিন্দুবাদ শুধু ধর্মই নয়, প্রকৃতপক্ষে দুটি ভিন্ন ও সুনির্দিষ্ট সামাজিক ব্যবস্থাও বটে। মুসলমানও আমি তাগণ কখনো এক জাতি হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে, এটা আশা করা নিছক স্বপ্নতুল্য। একটি অভিন্ন ভারতের স্রান্ত হিল তার সকল সীমা ছাড়িয়ে গেছে। এ ভ্রান্ত ধারণাই আমাদের অধিকাংশ দুর্ভাগ্যের কারণ এবং সময়মত এ ধারণা সংশোধন করতে না পারলে তা ভারতকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিবে।
হিন্দু ও মুসলিম জনগণ দুটি পৃথক ধর্মীয় দর্শন, সামাজিক আচার-আচরণ এবং সাহিত্যের অধিকারী। তাদের সভ্যতা আলাদা এবং পরস্পর বিরোধী ধ্যান-ধারণা ও চিন্তা-ভাবনাকে আশ্রয় করে সে সভ্যতা গড়ে উঠেছে। জীবনের প্রতি এবং জীবন সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা। হিন্দু ও মুসলিম জনগণ অনুপ্রেরণা লাভ করে ভিন্ন ভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে। তাদের মহাকাব্য ভিন্ন, পূজনীয় বীর আলাদা এবং আলাদা তাদের সুখ-দুঃখের কাহিনী। প্রায়শ একের কাছে যিনি বীররূপে আদূত, অন্যের কাছে তিনি শত্রু বলে ঘৃণিত। অনুরূপভাবে একের কাছে যা জয়, অন্যের কাছে তা পরাজয় বলে বিবেচিত। একটি সংখ্যালঘু এবং অপরটি বিপুলভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ । এরূপ দুটি জাতিকে একটি অভিন্ন রাষ্ট্রের জোয়ালে বাঁধলে ক্রমান্বয়ে তা অসন্তোষ বৃদ্ধির দিকেই এগিয়ে যাবে এবং এরূপ রাষ্ট্রের প্রয়োজনে গঠিত কাঠামোরও চূড়ান্ত ধ্বংস ডেকে আনবে। "২০
সুতরাং জিন্নাহ দাবি করেন যে, "ভারতের হিন্দু ও মুসলমানরা দুটি পৃথক জাতি। ভারতের মুসলমানরা একটি পৃথক জাতি। তাই তাদের প্রয়োজন একটি পৃথক আবাসভূমি বা রাষ্ট্রের।" ১৯৪০ সালের জানুয়ারি মাসে মি. জিন্নাহ মন্তব্য করেন যে, ভারতে দুটি জাতি রয়েছে এবং মাতৃভূমির শাসন ব্যবস্থায় উভয় জাতির অংশগ্রহণ থাকতে হবে।
দ্বিজাতি তত্ত্ব হল এমন একটি মতাদর্শ যেখানে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের প্রাথমিকভাবে কেবলমাত্র তাদের ধর্মের মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ভারতীয় মুসলমান এবং হিন্দু দুটি স্বতন্ত্র জাতীয়তার পরিচয় দেয়া হয়েছে, এবং যেখানে ভাষা, বর্ণ এবং অন্যান্য বৈশিষ্টের তুলনায় ধর্মকে বেশি প্রধান্য দেয়া হয়েছে। পাকিস্তান আন্দোলন এবং ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের অন্যতম কারণ ছিলো এই দ্বিজাতি তত্ত্ব।