১৯৫৪ সালের পূর্ব বাংলার নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয় পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতিসত্তার জাগরণ এবং স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনকে সুদৃঢ় করে।১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয় ছিল তৎকালীন পূর্ব বাংলার জনমানসে স্বাধিকার ও জাতিসত্তার উত্থানের বহিঃপ্রকাশ। এটি শুধু একটি নির্বাচনি বিজয় ছিল না; বরং পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে বাঙালির রাজনৈতিক চেতনার জাগরণ ও আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রবল আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ছিল। মুসলিম লীগের জনপ্রিয়তা হারিয়ে বাঙালি জনগণের আস্থা হারানোর প্রক্রিয়াটিও এই নির্বাচনের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৯৫৩ সালে গঠিত যুক্তফ্রন্ট ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে জনমত সংগঠিত করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। এই বিজয় পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন মাত্রা যুক্ত করে। ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের শোচনীয় পরাজয় বাঙালিদের কেন্দ্রবিমুখ মনোভাব ও স্বতন্ত্র জাতিসত্তার প্রমাণ দেয়। বাঙালি মুসলিম লীগের নেতারাও এ নির্বাচনের মাধ্যমে জনআস্থা হারান। নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের জয় বাংলার জনগণের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের প্রতি গণসমর্থন নিশ্চিত করে। একইসঙ্গে সংবিধান প্রণয়নে বাঙালিদের অংশগ্রহণের পথ সুগম হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই বিজয়ের ফলে বাংলাভাষার প্রশ্নে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আপোষে বাধ্য হয় এবং বাংলা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পায়। যদিও যুক্তফ্রন্ট সরকার দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, তবে এই নির্বাচনের মধ্য দিয়েই বাঙালি জাতি প্রথমবারের মতো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় স্বাধিকার চেতনার প্রকাশ ঘটায়, যা পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতা আন্দোলনের ভিত্তি গড়ে দেয়।আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচন বাঙালির রাজনৈতিক অগ্রযাত্রায় একটি মাইলফলক, যা স্বাধীনতার পথে ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করে।