উদ্দীপকের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ আরব-সিন্ধু বিরোধের পরিণতি অধিকতর তাৎপর্যপূর্ণ ছিল— উক্তিটি যথার্থ ।
আরবদের সিন্ধু বিজয়ের ফলাফল সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। কেউ কেউ এ বিজয়কে নিষ্ফল বলেছেন। তবে সার্বিকভাবে বিবেচনা করলে দেখা যায়— এ বিজয় আরবদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ ফল বয়ে এনেছিল।
বহুকাল আগে থেকেই ভারতবর্ষে আরব বণিক ও ধর্ম প্রচারকদের আগমন ঘটে। সিন্ধু ও মুলতান বিজয়ের পর ভারতবর্ষে অনেক সুফি দরবেশের আগমন ঘটে। তাদের প্রচারিত ইসলামের শাশ্বত বাণী সাম্য, মৈত্রী, সহিষ্ণুতা, উদারতা বর্ণপ্রথার কঠিন নিগড়ে নির্যাতিত "হিন্দু সম্প্রদায়কে আকৃষ্ট করে। ফলে তারা বিপুল সংখ্যক ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়। আরবদের সিন্ধু বিজয়ের ফলে মুসলমানরা হিন্দুদের প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে আসে। এতে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রীতির সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আরব মুসলমানদের অনেকে বিজিত অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে এবং স্থানীয় নারীদের বিয়ে করে। আরব বসতি ও আন্তঃবিবাহের ফলে আরবদের মধ্যে সিন্ধুর লোকাচার ও সামাজিক রীতিনীতি প্রবেশ করে। অন্যদিকে সিন্ধুবাসীর জীবনেও অনেক আরবীয় বৈশিষ্ট্যের প্রভাব পড়ে। আর্য ও সেমেটিক জাতির সংমিশ্রণে এক নতুন জাতির উদ্ভব ঘটে। আর এ জাতিই প্রকৃতপক্ষে ইন্দো-সারাসেনীয় সভ্যতা ও কৃষ্টির ধারক ও বাহক হিসেবে ইতিহাসে খ্যাতি অর্জন করে। তবে আরবদের রাজনৈতিক ফলাফল তেমন সন্তোষজনক ছিল না বলে অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন। ঐতিহাসিক এ.বি.এম. হবিবুল্লাহ বলেন, 'আরবরা ভারতে ইসলামকে রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করার সৌভাগ্য অর্জন করতে পারেনি।' তা সত্ত্বেও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সিন্ধু বিজয়কে সম্পূর্ণ নিষ্ফল বিজয় বলা যায় না। কারণ সিন্ধু ও মুলতান বিজয় তাৎক্ষণিকভাবে ভারতের বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে প্রভাব বিস্তার করতে না পারলেও আরব বিজয়ের পথ অনুসরণ করেই গজনভি ও ঘুরিরা ভারতে মুসলিম কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল ।
উপরের আলোচনা থেকে বোঝা যায়, সিন্ধু বিজয় আরববাসীর জীবনে রাজনৈতিকভাবে কিছুটা কম প্রভাব ফেললেও সামাজিক ও ধর্মীয় দিক দিয়ে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। তাই বলা যায়, আরব-সিন্ধু বিরোধ বা সিন্ধু অভিযানের পরিণতি ছিল অধিকতর তাৎপর্যপূর্ণ।