উদ্দীপকে উল্লিখিত সমাজের অবস্থা যেন প্রাক-মুসলিম ভারতবর্ষের আর্থসামাজিক চিত্র- মন্তব্যটি যথার্থ।
মুহাম্মদ বিন কাসিম ও সুলতান মাহমুদের ভারত আক্রমণের সময় ভারতের সামাজিক অবস্থা শোচনীয় ছিল এবং এখানে জাতিভেদ ও বর্ণভেদ প্রথা ছিল প্রকট। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র-এ চার শ্রেণিতে হিন্দু সমাজ বিভক্ত ছিল। এক শ্রেণির সাথে অন্য শ্রেণির ছেলেমেয়ের বিয়েশাদী, সামাজিক লেনদেন কল্পনাই করা যেত না। এসময়ে বৈশ্যদের ধর্মীয় বাণী শোনা অপরাধ ছিল। তারা সকল সুবিধা বঞ্চিত ছিল। সামাজিক বিভেদ জাতীয় চেতনা গঠনের অন্তরায় ছিল। সকল সুযোগ-সুবিধা ব্রাহ্মণরা ভোগ করত। বর্ণভেদজনিত কারণে ব্রাহ্মণরা সাধারণত ধর্ম-কর্ম ও আচার-অনুষ্ঠানে ব্যস্ত থাকত। ক্ষত্রিয়রা যুদ্ধবিগ্রহ, বৈশ্যরা ব্যবসায় বাণিজ্য ও শূদ্ররা কৃষি ও সাধারণ বৃত্তি পেশায় নিয়োজিত ছিল। গবেষক ও অধ্যাপক মুহাম্মদ ইনাম-উল-হক বলেন, "হিন্দুদের মধ্যে শ্রেণিবিভাগ নীতি নিম্নস্তরের লোকদের ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।" সমাজে একাধিক বিবাহ প্রথা প্রচলিত থাকলেও বিধবা বিবাহ প্রথার প্রচলন ছিল না। প্রাচীন ভারতে স্বামীর মৃত্যু হলে স্ত্রীকে সহমরণ বরণ করতে হতো- যা সতীদাহ প্রথা নামে খ্যাত। সতীদাহ বলতে বোঝায় স্বামী মারা গেলে স্ত্রীকে সামাজিক রীতি অনুযায়ী স্বামীর চিতায় পুড়িয়ে মারার রীতি। সমাজে অস্পৃশ্যতাও বজায় ছিল। মৌর্যযুগে ভারতবর্ষে দাসপ্রথা সামাজিক অনুশাসনে পরিণত হয়। নারীদের হাটবাজারে ক্রয়-বিক্রয় করা হতো এবং তাদেরকে প্রাসাদে দাসদাসীরূপে নিয়োগ করা হতো। তবে মৌর্য যুগে ভারতীয় সমাজে নারীদের মর্যাদা ছিল এবং তারা সাহিত্য ও দর্শনে কৃতিত্বের অধিকারী ছিল। হিন্দুধর্ম ও সমাজের ওপর মন্তব্য প্রসঙ্গে ড. ঈশ্বরীপ্রসাদ বলেন, "ধর্ম কুসংস্কারে ভারাক্রান্ত ছিল এবং সমাজ একটি কঠোর বর্ণ নীতির আওতায় আবদ্ধ ছিল। যা বিভিন্ন দলের মধ্যে ঐক্য স্থাপনকে অসম্ভব করে তুলেছিল।" সামন্ততান্ত্রিক অর্থব্যবস্থায় রাজা, ব্রাহ্মণ ও অভিজাতদের তুলনায় নিম্নবর্ণের লোকদের নিদারুণ কষ্টভোগ করতে হতো। কৃষককুল হাড়ভাঙা পরিশ্রম করলেও তারা ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হতো।
পরিশেষে বলা যায়, উদ্দীপকে প্রাক-মুসলিম ভারতবর্ষের আর্থসামাজিক অবস্থার অনুরূপ চিত্র ফুটে ওঠেছে।