না, আমি মনে করি উক্ত কারণগুলোর ফলেই মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ঘটেনি। তাদের পতনের পিছনে আরও কারণ ছিল।মুঘলদের পতনের প্রাকৃতিক কারণ সম্প্রদয়ের বিশালতা, হিন্দুদের বিরোধিতা ও বাহ্যিক আক্রমণ অত্যতম কারণ ছিল। ভাঙাগড়া পৃথিবীর চিরন্তন রীতি। কোনোকিছু গড়ার সময় যেরূপ অদম্য উৎসাহ-উদ্দীপনা থাকে, অবক্ষয়ের যুগে তা সেরূপ থাকে না। মুঘল সাম্রাজ্যের প্রথম ছয় জন শাসকের কর্মনিষ্ঠ, অদম্য উৎসাহ, পরিশ্রম করার মানসিকতা ইত্যাদি ইতিবাচক গুণগুলো যে পরিমাণ ছিল পরবর্তী শাসকদের তার কিছুই ছিল না। ফলে স্বাভাবিক কারণেই মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে। উত্তরে আফগানিস্তান, পূর্বে আসাম, পশ্চিমের কাশ্মীর ও দক্ষিণে মহীশূর পর্যন্ত মুঘল সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল। মধ্যযুগে বিশাল সাম্রাজ্য একজন শাসকের পক্ষে শাসন করা ছিল খুব কষ্টকর। সাম্রাজ্যের বিশালতার সুযোগে বিদ্রোহিগণ বিদ্রোহ করতে উৎসাহবোধ করত। এতে করে মুঘল সাম্রাজ্যের পতন হয়। এছাড়া সৈন্যবাহিনীর, নৈতিক অধঃপতনও মুঘলদের পতনে ভূমিকা রাখে। তাছাড়া শাহজাহানের অমিত ব্যয় এবং আওরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য অভিযানের ব্যয়ে রাজকোষে আর্থিক সংকট দেখা দেয়। পরবর্তী শাসকদের আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি হতো, ফলে চরম আর্থিক সংকটে পতিত হয়ে এ সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। মুঘল শাসনামলের শেষদিকে হিন্দু জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, বিশেষ করে মারাঠা, শিখ ও রাজপুত তথা গোটা হিন্দু জাতির পুনর্জাগরণ, প্রতিরোধমূলক কর্মকাণ্ড এবং তাদের বিদ্রোহ মুঘল শক্তি বিনষ্ট করে দেয়। এ অবস্থায় নাদির শহরে আক্রমণ, আহমদ শাহ আবদালির আক্রমণ, ইউরোপীয়দের আগমন এবং সর্বোপরি ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহ মুঘলদের চুড়ান্ত পতন ঘটায়।
সাংস্কৃতিকক্ষেত্রে ব্যাপক বৈষম্য বিরাজমান ছিল। পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের সংস্কৃতির ওপর আঘাত আসে। প্রথম আঘাত আসে মাতৃভাষা বাংলার ওপর। পাকিস্তান, সরকার বাঙালি সংস্কৃতি বিকাশে কোনো ভূমিকা পালন করেনি। পূর্ব পাকিস্তানের জন্য তারা সুস্থ, সুন্দর ও গঠনমূলক বিনোদন ব্যবস্থাও গড়ে তোলেনি। শিশু ও বৃদ্ধদের মানসিক ও শারীরিক উন্নতির জন্য ভালো কোনো প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বা ভালো পার্ক, অবসর বিনোদনের স্থান, শিশুপার্ক ইত্যাদির কোনো ব্যবস্থা ছিল না। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের দুই অংশের সমাজ কাঠামো ও সামাজিক জীবনযাত্রা প্রণালি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। একই দেশের অধিবাসী হওয়া সত্ত্বেও ভাষা, শিল্প, সাহিত্য, আচার-আচরণ, পোশাক-পরিচ্ছদ, আহার-বিহার, আবেগ-অনুভূতি এককথায় সামাজিক জীবনের সবক্ষেত্রে তারা পৃথক ছিল। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় পূর্ব পাকিস্তানের তুলনার পশ্চিম পাকিস্তানের সবকিছুই ছিল উন্নত।অতএব অর্থনৈতিক বৈষম্য ছাড়াও শিক্ষা ও সামাজিক ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ করত।